নামাজ, ইবাদত ও ধর্মীয় শিক্ষার জন্য নির্মিত মসজিদের মার্বেল টাইলসই যেন হয়ে উঠেছে কারও কারও ব্যক্তিগত অনুভূতি প্রকাশের খাতা। ময়মনসিংহের ঈশ্বরগঞ্জ মডেল মসজিদের সাদা মার্বেল টাইলসে কালো কালি দিয়ে লেখা হয়েছে প্রেমের বার্তা, জোড়ার নাম, তারিখ ও হৃদয়চিহ্ন। কোথাও আবার আল্লাহর কাছে করা হয়েছে দুইজনের সম্পর্ক কবুলের প্রার্থনা। এমনকি ইংরেজিতেও লেখা হয়েছে—‘Faria + Ziha’, ‘R + J’ ও ‘My Best Friend’।
ঘটনাটি কেবল মসজিদের টাইলসে কিছু লেখা বা আঁকিবুঁকির মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকছে না। প্রশ্ন উঠছে—পবিত্র একটি স্থাপনায় এমন কর্মকাণ্ডের সুযোগ তৈরি হলো কীভাবে? এটি কি কেবল কয়েকজন কিশোর-কিশোরীর দুষ্টুমি, নাকি এর পেছনে রয়েছে পারিবারিক ও সামাজিক মূল্যবোধের বড় কোনো সংকট?
সম্প্রতি মসজিদের বিভিন্ন স্থানের এসব লেখার ছবি প্রকাশ্যে আসার পর স্থানীয়ভাবে বিষয়টি নিয়ে আলোচনা শুরু হয়। ছবিতে মসজিদের সিঁড়ি, রেলিংসংলগ্ন মার্বেল অংশ ও দেয়ালের বিভিন্ন স্থানে বাংলা ও ইংরেজিতে বিভিন্ন নাম, জোড়ার নাম, তারিখ, হৃদয়চিহ্ন এবং প্রেমসংক্রান্ত বার্তা দেখা যায়।
একটি টাইলসে লেখা হয়েছে, ‘হে আল্লাহ আমাদের দুইজনের প্রতিটি কথা কবুল করে নিও।’ এর পাশে রয়েছে হৃদয়চিহ্ন। অন্য একটি টাইলসে লেখা ‘Faria + Ziha’। আরেকটিতে ‘R + J’। কোথাও আবার রয়েছে ‘My Best Friend’।
এসব লেখা কখন করা হয়েছে, কারা করেছে এবং কতদিন ধরে মসজিদের বিভিন্ন স্থানে এমন লেখালেখি চলে আসছে—এসব প্রশ্নেরও স্পষ্ট উত্তর পাওয়া যায়নি।
বিষয়টি সামনে আসার পর মসজিদের ইমাম ও খতিব মুফতি আহসানুল্লাহ কাসেমী সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে সতর্কবার্তা দেন। শনিবার রাত সাড়ে ৮টার দিকে নিজের ফেসবুক অ্যাকাউন্টে তিনি লেখাগুলোর ছবিও প্রকাশ করেন।
পোস্টের শুরুতেই তিনি লেখেন, ‘মডেল মসজিদকে সাক্ষী রেখে প্রেম নিবেদন।’ এরপর মসজিদের সৌন্দর্য ও পবিত্রতা রক্ষার আহ্বান জানিয়ে তরুণ-তরুণীদের অবৈধ সম্পর্কের পরিবর্তে বিয়ের মাধ্যমে সম্পর্ককে বৈধ করার পরামর্শ দেন।
মসজিদের চারপাশে সিসিটিভি ক্যামেরা থাকার বিষয়টিও উল্লেখ করেন তিনি। তরুণ-তরুণীদের সতর্ক করে বলেন, মসজিদ এলাকায় তাদের কর্মকাণ্ড ক্যামেরায় ধারণ হতে পারে। পাশাপাশি টাইলসে প্রেমের কাহিনি লিখে স্থাপনার সৌন্দর্য নষ্ট না করার আহ্বান জানান।
রসিকতার ছলে পোস্টের শেষ দিকে তিনি লেখেন, ‘বিশ্বেশ্বরীর বাবুরা! বি কেয়ারফুল।’
স্থানীয়ভাবে এসব লেখার সঙ্গে ঈশ্বরগঞ্জ বিশ্বেশ্বরী সরকারি পাইলট উচ্চ বিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের সম্পৃক্ততার কথা জানা গেলেও কারা এসব লেখা লিখেছে, কখন লিখেছে কিংবা সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা সত্যিই ওই শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের শিক্ষার্থী কি না—তা স্বাধীনভাবে নিশ্চিত হওয়া যায়নি।
ফলে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছবি দেখে কোনো ব্যক্তি বা নির্দিষ্ট শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের শিক্ষার্থীদের দায়ী করা নিয়েও সতর্ক থাকা প্রয়োজন বলে মনে করছেন স্থানীয় সচেতন ব্যক্তিরা।
মসজিদের চারপাশে সিসিটিভি ক্যামেরা থাকার কথা জানিয়েছেন ইমাম। তাহলে প্রশ্ন উঠছে—ক্যামেরা থাকা সত্ত্বেও টাইলস ও দেয়ালে এসব লেখা কীভাবে হলো? নিয়মিত নজরদারি করা হয় কি না, ক্যামেরার ফুটেজ কতদিন সংরক্ষণ করা হয় এবং এমন ঘটনা ঘটলে তাৎক্ষণিকভাবে ব্যবস্থা নেওয়ার কোনো প্রক্রিয়া আছে কি না—এসব বিষয়ও সামনে এসেছে।
তবে এসব প্রশ্নের বিষয়ে মসজিদ কর্তৃপক্ষের আনুষ্ঠানিক কোনো বক্তব্য পাওয়া যায়নি।
মুফতি আহসানুল্লাহ কাসেমী বলেন, মসজিদ আল্লাহর ঘর এবং একটি পবিত্র স্থান। সেখানে কোনো অনভিপ্রেত কর্মকাণ্ড কাম্য নয়। তিনি জানান, সিসিটিভি ফুটেজে অনেক তরুণকে ধূমপান করতেও দেখা গেছে। এসব বিষয় বিবেচনায় নিয়েই সতর্কতামূলক পোস্টটি দেওয়া হয়েছে।
কিন্তু ঘটনাটি আরও একটি বড় প্রশ্ন সামনে এনেছে—কিশোর-কিশোরীদের কাছে পবিত্র স্থান, সামাজিক শৃঙ্খলা ও জনসম্পদের প্রতি দায়িত্ববোধের শিক্ষা কতটা পৌঁছাচ্ছে?
কারণ একটি টাইলসে লেখা নাম হয়তো কয়েক মুহূর্তের আবেগের বহিঃপ্রকাশ। কিন্তু সেই লেখা মুছে যাওয়ার আগ পর্যন্ত সেটি একটি সার্বজনীন ধর্মীয় স্থাপনার সৌন্দর্য ও পরিবেশকে ক্ষতিগ্রস্ত করে। ব্যক্তিগত অনুভূতি প্রকাশের স্বাধীনতা থাকলেও তা ধর্মীয় অনুভূতি, সম্পদ ও প্রতিষ্ঠানের পবিত্রতা ক্ষুণ্ন করার অধিকার দেয় না।
স্থানীয় সচেতন মহলের মতে, ঘটনাটিকে শুধু ‘প্রেমের দুষ্টুমি’ হিসেবে দেখলে সমস্যাটির গভীরে যাওয়া হবে না। পরিবারে নৈতিক শিক্ষা, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে মূল্যবোধের চর্চা, ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানে শৃঙ্খলা এবং সামাজিক পরিবেশ—সবকিছুর সমন্বিত প্রভাবেই একজন কিশোরের আচরণ গড়ে ওঠে।
তাই কারা লিখেছে, তাদের খুঁজে শাস্তি দেওয়ার পাশাপাশি কেন এমন আচরণ ঘটছে, সেটিও খতিয়ে দেখা জরুরি। একই সঙ্গে মসজিদের মতো জনসাধারণের ব্যবহৃত ধর্মীয় স্থাপনায় দর্শনার্থীদের আচরণবিধি, নজরদারি ও সচেতনতামূলক ব্যবস্থা আরও কার্যকর করার দাবি উঠেছে।
ঈশ্বরগঞ্জ মডেল মসজিদের টাইলসে লেখা কয়েকটি নাম ও প্রেমের বার্তা হয়তো সহজেই মুছে ফেলা সম্ভব। কিন্তু এর সঙ্গে যে প্রশ্নটি উঠে এসেছে, তা এত সহজে মুছে ফেলার নয়।
পবিত্র স্থানে ব্যক্তিগত আবেগের এমন প্রকাশ কি নিছক কিশোরসুলভ দুষ্টুমি, নাকি এটি ক্রমশ দুর্বল হয়ে পড়া সামাজিক মূল্যবোধের একটি দৃশ্যমান চিহ্ন?
উত্তর খুঁজতে হলে শুধু টাইলস পরিষ্কার করলেই হবে না; পরিবার, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, ধর্মীয় প্রতিষ্ঠান ও সমাজ—সব পক্ষকেই নিজেদের দায়িত্বের জায়গাটি নতুন করে ভাবতে হবে।

























