কৃষক বাঁচলে দেশ বাঁচবে—এই স্লোগানকে সামনে রেখে মাদারীপুরের শিবচরে কৃষকদের উৎপাদিত পেঁয়াজ দীর্ঘসময় সংরক্ষণের মাধ্যমে নায্যমূল্য নিশ্চিত করার লক্ষ্যে এক যুগান্তকারী উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। ২০২৫-২৬ অর্থবছরে কৃষি প্রণোদনা কর্মসূচির আওতায় ক্ষুদ্র ও প্রান্তিক কৃষকদের মাঝে বিনামূল্যে এয়ারফ্লো মেশিন বিতরণের উদ্বোধন করা হয়েছে।
উপজেলা কৃষি অফিস চত্বরে আয়োজিত এই অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন মাদারীপুর-১ (শিবচর) আসনের মাননীয় জাতীয় সংসদ সদস্য জনাব সাইদ উদ্দিন আহমাদ হানজালা।সভাপতিত্ব করেন: শিবচর উপজেলার নির্বাহী অফিসার এইচ. এম. ইবনে মিজান।
অনুষ্ঠানটি বাস্তবায়ন করেছে কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর, শিবচর, মাদারীপুর।
উপজেলা কৃষি অফিসার মোঃ আলিমুজ্জামান খান কৃষিতে সরকারের এই বিশেষ উদ্যোগের বিভিন্ন প্রযুক্তিগত ও অর্থনৈতিক দিক তুলে ধরেন।
সারা দেশে প্রতিবছর প্রায় ২ লক্ষ ৮৬ হাজার হেক্টর জমিতে প্রায় ৪২ লক্ষ টন পেঁয়াজ উৎপাদিত হয়। এর বিপরীতে দেশের চাহিদা প্রায় ৩৫ থেকে ৩৬ লক্ষ টন। ঘাটতি মেটাতে বিদেশ থেকে পেঁয়াজ আমদানির ফলে দাম অনিয়ন্ত্রিত হয়ে পড়ে এবং দেশীয় কৃষকরা তাদের ন্যায্যমূল্য থেকে বঞ্চিত হন। এই সংকট কাটাতেই সরকার এয়ারফ্লো মেশিন বিতরণের উদ্যোগ নিয়েছে।
মাদারীপুর জেলায় মোট ৫০টি এবং শিবচর উপজেলায় ২৫টি এয়ারফ্লো মেশিন বরাদ্দ পাওয়া গেছে। প্রতিটি মেশিনের মোট সরকারি বরাদ্দ ২৮,১০০ টাকা। এর মধ্যে মেশিন বাবদ ২১,০০০ টাকা এবং ঘরের মেজে ও দেওয়াল তৈরির জন্য কৃষক পাবেন ৭,০০০ টাকা।
টেকনোলজি ও ব্যবহার পদ্ধতি:
সংরক্ষণের জন্য ১০ ফুট দৈর্ঘ্য, ১০ ফুট প্রস্থ এবং ৬ ফুট উচ্চতার চারটি দেওয়াল তৈরি করতে হবে।
দেওয়ালের নিচে বাঁশের এমনভাবে মাজা (মাচা) তৈরি করতে হবে, যাতে হাওয়া চলাচল করতে পারে কিন্তু পেঁয়াজ নিচে পড়ে না যায়। মাজার মাঝখানে এয়ারফ্লো মেশিনটি স্থাপন করতে হবে।
মেশিনের সাথে থাকা টাইমারের মাধ্যমে প্রয়োজন অনুযায়ী সময় নির্ধারণ করা যাবে (যেমন: ১ ঘণ্টা সচল ও ১ ঘণ্টা বন্ধ রাখা)। মেশিনটিতে ১ বছরের রিপ্লেসমেন্ট গ্যারান্টি, ৩ বছর পর্যন্ত পার্টস রিপ্লেসমেন্ট এবং ১০ বছর পর্যন্ত বিনামূল্যে পরামর্শ ও সার্ভিসিং সেবা দেওয়া হবে।
এই মেশিনের সাহায্যে ৩০ থেকে ৩৫ শতাংশ পচন রোধ করা সম্ভব হবে। কৃষকরা তাড়াহুড়ো করে কম দামে পেঁয়াজ বিক্রি না করে ভালো দাম পেলে বাজারে ছাড়তে পারবেন। এছাড়া সরকার সারের পেছনে বিপুল পরিমাণ ভর্তুকি দিচ্ছে (যেমন: ১ কেজি ডিএপি সার আমদানিতে ১২৫ টাকা খরচ হলেও কৃষক পর্যায়ে মাত্র ২১ টাকায় দেওয়া হচ্ছে)। অতিরিক্ত রাসায়নিক সারের ব্যবহার কমিয়ে জৈব সারের ব্যবহার বাড়াতে এবং মাঠ পর্যায়ের উপসহকারী কৃষি কর্মকর্তাদের পরামর্শ নেওয়ার আহ্বান জানান তিনি।
প্রধান অতিথির বক্তব্যে মাননীয় সংসদ সদস্য জনাব সাইদ উদ্দিন আহমাদ হানজালা বলেন, বর্তমান সময়ে কৃষির ঐতিহ্য ও কৃষিজমি দিন দিন সংকুচিত হয়ে দালানে রূপ নিচ্ছে। বিগত বছরগুলোতে পেঁয়াজ নিয়ে যে সংকট ও সিন্ডিকেটের দৌরাত্ম্য দেখা গেছে, তা থেকে কৃষকদের সুরক্ষা দিতেই সরকার এই উদ্যোগ গ্রহণ করেছে।
আপনাদের মনমানসিকতা যেন ভেঙে না যায়। পেঁয়াজ তোলার পর আগামী ৫ দিনের মধ্যে বিক্রি করতে না পারলে পচে যাবে—এই দুশ্চিন্তায় আপনাদের রাতে যেন ঘুমে ব্যাঘাত না ঘটে। সরকার চায় আপনারা রাতে আরামে ঘুমাতে পারেন। কোনো সিন্ডিকেটের কবলে পড়ে বাধ্য হয়ে কম দামে যেন আপনাদের ফসল বিক্রি করতে না হয়। এই এয়ারফ্লো মেশিন ব্যবহার করে আপনারা ২০০ থেকে ৩০০ মণ পর্যন্ত পেঁয়াজ নিরাপদে সংরক্ষণ করতে পারবেন এবং বাজারদর অনুকূলে এলে তা ধীরে ধীরে বিক্রি করে লাভবান হতে পারবেন।


























