নওগাঁর ইতিহাসে কৃষকের অধিকার আদায়ের সংগ্রামের কথা উঠলেই যে নামটি সর্বাগ্রে উচ্চারিত হয়, তিনি হলেন আস্তান মোল্লা। তিনি কোনো জমিদার, রাজনীতিবিদ বা উচ্চশিক্ষিত ব্যক্তি ছিলেন না। একজন সাধারণ কৃষক হয়েও অসাধারণ নেতৃত্ব, সাহস ও ন্যায়বোধের মাধ্যমে তিনি হাজারো নির্যাতিত মানুষের আশ্রয়স্থলে পরিণত হন। আজও নওগাঁর লোককথা, ইতিহাস এবং মানুষের স্মৃতিতে তিনি অন্যায়ের বিরুদ্ধে প্রতিরোধের এক উজ্জ্বল প্রতীক।
ঊনবিংশ শতাব্দীর শেষভাগে দুবলহাটি জমিদারির অধীন প্রজাদের জীবন ছিল অত্যন্ত কষ্টকর। অতিরিক্ত খাজনা আদায়, নানা অযৌক্তিক কর, ফসল ও গবাদিপশু বাজেয়াপ্ত করা এবং বিভিন্ন ধরনের নিপীড়নের অভিযোগ ছিল ব্যাপক। এমন পরিস্থিতিতে সদর উপজেলার হাঁসাইগাড়ী গ্রামের আস্তান মোল্লা উপলব্ধি করেন যে বিচ্ছিন্ন প্রতিবাদে পরিবর্তন সম্ভব নয়। তাই তিনি গ্রামের পর গ্রাম ঘুরে কৃষকদের সংগঠিত করতে শুরু করেন।
স্থানীয় ইতিহাস ও জনশ্রুতি অনুযায়ী, ১৮৯৩ সালের দিকে তার নেতৃত্বে প্রায় ৫০টি গ্রামের হাজার হাজার কৃষক ঐক্যবদ্ধ আন্দোলনে অংশ নেন। দীর্ঘ কয়েক বছর ধরে চলা এই গণআন্দোলনের ফলে জমিদারপক্ষ প্রবল চাপের মুখে পড়ে এবং অতিরিক্ত খাজনা আদায়ের নীতি থেকে সরে আসতে বাধ্য হয়। এই আন্দোলন উত্তরাঞ্চলের কৃষক অধিকার প্রতিষ্ঠার ইতিহাসে একটি গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায় হিসেবে বিবেচিত হয়।
আস্তান মোল্লা শুধু আন্দোলনের নেতৃত্বই দেননি, তিনি আইনের আশ্রয় নিয়েও কৃষকদের অধিকার প্রতিষ্ঠার চেষ্টা করেন। তৎকালীন নওগাঁ আদালতে কৃষকদের স্বার্থ রক্ষায় তিনি মামলা করেন বলে স্থানীয় ইতিহাসে উল্লেখ পাওয়া যায়। তদন্ত ও বিচারিক প্রক্রিয়ায় কৃষকদের অভিযোগের যৌক্তিকতা স্বীকৃতি পেলে জমিদারপক্ষের প্রভাব অনেকটাই কমে যায়। এ সময় থেকেই লোকমুখে একটি প্রবাদ প্রচলিত হয় যে, অত্যাচারী শাসকের চেয়ে সংগঠিত জনগণের শক্তি অনেক বড়।
তার ব্যক্তিগত সাহসিকতার বহু কাহিনি এখনও নওগাঁ অঞ্চলে প্রচলিত। একটি জনপ্রিয় জনশ্রুতি অনুযায়ী, জমিদার পরিবারের এক সদস্য মাদী ঘোড়ায় চড়ে যাওয়ার সময় আস্তান মোল্লা প্রকাশ্যে প্রশ্ন তোলেন, যখন সাধারণ প্রজাদের মাদী গরু দিয়ে হালচাষে বাধা দেওয়া হয়, তখন জমিদারপক্ষ কীভাবে একই ধরনের প্রাণী ব্যবহার করে? তার এই প্রতিবাদ কৃষকদের মনে সাহস জোগায় এবং অন্যায়ের বিরুদ্ধে মুখ খুলতে অনুপ্রাণিত করে।
১৯৩১ সালের ভয়াবহ বন্যার সময়ও আস্তান মোল্লার মানবিক নেতৃত্বের পরিচয় পাওয়া যায়। বিস্তীর্ণ এলাকা পানিতে ডুবে গেলেও জমিদারপক্ষের ভয়ে কেউ বাঁধ কাটতে সাহস করছিল না। তিনি স্থানীয় প্রশাসনের সহযোগিতা নিয়ে কৃষকদের সঙ্গে বাঁধ কেটে পানি নিষ্কাশনের উদ্যোগ নেন। এর ফলে বহু মানুষ ও ফসল বড় ধরনের ক্ষতির হাত থেকে রক্ষা পায়।
১৮৫০ সালে নওগাঁ সদর উপজেলার হাঁসাইগাড়ী গ্রামে তার জন্ম। পিতা ছিলেন আসফদি মোল্লা। সাধারণ জীবনযাপনই ছিল তার পরিচয়। খালি পায়ে গ্রামের পর গ্রাম ঘুরে মানুষের দুঃখ-দুর্দশা শুনতেন এবং তাদের অধিকার সম্পর্কে সচেতন করতেন। ১৯৪০ সালে প্রায় ৯০ বছর বয়সে তিনি মৃত্যুবরণ করেন।
তার অবদানকে স্মরণীয় করে রাখতে ১৯৯২ সালে নওগাঁ শহরে প্রতিষ্ঠিত হয় ‘আস্তান মোল্লা কলেজ’। এছাড়াও স্থানীয় ইতিহাস, গবেষণা এবং প্রবীণদের স্মৃতিচারণে তিনি আজও ন্যায়, সাহস এবং গণঅধিকার আন্দোলনের অন্যতম প্রতীক হিসেবে সম্মানের সঙ্গে স্মরণীয়।
উল্লেখ্য: আস্তান মোল্লাকে ঘিরে প্রচলিত অনেক ঘটনা স্থানীয় জনশ্রুতি, মৌখিক ইতিহাস ও আঞ্চলিক বর্ণনার ওপর ভিত্তি করে পরিচিত। এসব ঘটনার কিছু অংশের পূর্ণাঙ্গ প্রামাণ্য ঐতিহাসিক দলিল সব ক্ষেত্রে পাওয়া যায় না। তাই গবেষণামূলক বা একাডেমিক লেখায় তথ্যের উৎস যাচাই করেই তা ব্যবহার করা উচিত।

মোঃ হাসান আলী 



















