মাদারীপুর সদর উপজেলায় এক লোমহর্ষক হত্যাকাণ্ডের ঘটনা ঘটেছে। ঘরে একা থাকার সুযোগ নিয়ে কাতারপ্রবাসীর তরুণী স্ত্রীকে ধারালো অস্ত্র দিয়ে কুপিয়ে হত্যা করেছে দুর্বৃত্তরা। হত্যাকাণ্ডের পর ঘরে থাকা একটি দামি আইফোন ছিনিয়ে নেওয়ার অভিযোগ উঠেছে। এটি পূর্বপরিকল্পিত খুন, না কি এর পেছনে অন্য কোনো রহস্য রয়েছে—তা উদ্ঘাটনে মাঠে নেমেছে পুলিশ।
মাদারীপুর সদর উপজেলার কালিকাপুর এলাকায় রাতের আঁধারে এক নৃশংস হত্যাকাণ্ডের শিকার হয়েছেন আইভী আক্তার (২৮) নামের এক গৃহবধূ। নিহত আইভী শরীয়তপুর সদর উপজেলার বাসিন্দা কাতারপ্রবাসী মো. ফেরদৌসের স্ত্রী। পারিবারিক অসচ্ছলতার কারণে ছোটবেলা থেকেই তিনি মাদারীপুরের কালিকাপুর এলাকার নিজ চাচা কালাম শরীফের বাড়িতে থেকে বড় হয়ে ওঠেন। প্রায় এক বছর আগে পরিবারের সম্মতিতে কিংবা আত্মীস্বজনের মাধ্যমে শরীয়তপুরের প্রবাসী ফেরদৌসের সঙ্গে তার বিয়ে হয়। বিয়ের কিছুদিন পরেই স্বামী ফেরদৌস কর্মসংস্থানের উদ্দেশ্যে কাতারে পাড়ি জমান। স্বামী প্রবাসে থাকায় তিনি চাচার বাড়ীতে বেড়াতে আসায় আইভী আক্তার কালিকাপুরেই অবস্থান করছিলেন।
পুলিশ ও স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, ঘটনার দিন অর্থাৎ মঙ্গলবার সন্ধ্যার দিকে একটি নিস্তব্ধ ও সুযোগসন্ধানী পরিবেশ তৈরি হয়। নিহতের চাচা কালাম শরীফ ও তার স্ত্রী বা আইভীর চাচিকে নিয়ে সন্ধ্যার দিক পারিবারিক জরুরি কাজে বাড়ির বাইরে যান। এই সুবর্ণ সুযোগে বাড়িতে সম্পূর্ণ একা হয়ে পড়েন আইভী আক্তার। আর ঠিক এই মুহূর্তটিকে কাজে লাগিয়ে অজ্ঞাতপরিচয় দুর্বৃত্তরা সুকৌশলে ঘরের ভেতর প্রবেশ করে।
বাড়ির ভেতরে কেউ না থাকার সুযোগে দুর্বৃত্তরা আইভীর মাথায় ও শরীরের বিভিন্ন স্থানে ধারালো অস্ত্র দিয়ে উপর্যুপরি কোপাতে থাকে। আকস্মিক এই হামলায় ঘটনাস্থলেই তার মৃত্যু হয়। হামলাকারীরা চলে যাওয়ার সময় নিহতের ব্যবহার্য একটি দামি আইফোন সঙ্গে করে নিয়ে যায় বলে অভিযোগ করেছে পরিবার।
রাত আনুমানিক আটটার দিকে চাচা কালাম শরীফ বাড়ি ফিরে আসেন। তিনি বাইরে থেকে মূল ফটকে তালা লাগিয়ে গেলেও ফিরে দেখেন ঘরের গেট ভেতর থেকে আটকানো এবং কোনো সাড়াশব্দ নেই। এরপর ঘরে প্রবেশ করতেই তার চোখ ছানাবড়া হয়ে যায়। ঘরের মেঝেতে রক্তাক্ত ও নিথর অবস্থায় পড়ে রয়েছে ভাতিজি আইভীর মরদেহ। চাচার আত্মচিৎকারে আশপাশের প্রতিবেশীরা দ্রুত ছুটে আসেন এবং চারদিকে শোরগোল পড়ে যায়। স্থানীয়রা সঙ্গে সঙ্গে বিষয়টি মাদারীপুর সদর মডেল থানা পুলিশকে অবহিত করেন।
খবর পাওয়ার সঙ্গে সঙ্গেই মাদারীপুর সদর মডেল থানা পুলিশের একটি দল দ্রুত ঘটনাস্থলে ছুটে যায়। পুলিশ ঘটনাস্থল থেকে নিহতের মরদেহ উদ্ধার করে সুরতহাল প্রতিবেদন প্রস্তুত করে। পরবর্তীতে ময়নাতদন্তের জন্য মরদেহ মাদারীপুর ২৫০ শয্যা বিশিষ্ট জেলা হাসপাতাল মর্গে পাঠানো হয়।
মাদারীপুর সদর মডেল থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) জানান, নিহত আইভী আক্তারের মাথায় ও শরীরে গুরুতর আঘাতের গভীর চিহ্ন রয়েছে। পুলিশ অত্যন্ত গুরুত্বের সাথে পুরো বিষয়টি খতিয়ে দেখছে। প্রাথমিকভাবে এটি নিছক চুরি বা ডাকাতির ঘটনা, নাকি এর পেছনে পূর্বশত্রুতা, পারিবারিক বিরোধ কিংবা ব্যক্তিগত সম্পর্কের কোনো জটিলতা রয়েছে—তা নিয়ে গভীর তদন্ত চলছে। অপরাধীদের চিহ্নিত করতে পুলিশের একাধিক গোয়েন্দা দল ও ক্রাইম সিন ইউনিট কাজ শুরু করেছে। তবে এ রিপোর্ট লেখা পর্যন্ত পুলিশ এই ঘটনায় জড়িত কাউকে এখনও আটক করতে পারেনি।
একজন প্রবাসীর স্ত্রীর এমন পৈশাচিক হত্যাকাণ্ডে পুরো কালিকাপুর এলাকাসহ মাদারীপুরজুড়ে সাধারণ মানুষের মধ্যে তীব্র আতঙ্ক ও ক্ষোভের সৃষ্টি হয়েছে। এলাকার নিরাপত্তা ব্যবস্থা ও প্রবাসীর পরিবারের সুরক্ষা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন স্থানীয়রা। দ্রুত সময়ের মধ্যে এই চাঞ্চল্যকর হত্যাকাণ্ডের মূল রহস্য উন্মোচন করে জড়িত খুনিদের গ্রেপ্তার এবং দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির দাবি জানিয়েছেন নিহতের পরিবার ও এলাকাবাসী।
































