ক্লাস, প্র্যাকটিক্যাল, অ্যাসাইনমেন্ট, প্রেজেন্টেশন,পরীক্ষা। এসব নিয়ে যেন বিশ্ববিদ্যালয় জীবনের প্রতিটি দিন। কখনো ক্লাসের ব্যস্ততার মাঝেই পরীক্ষা উঁকি দেয়, আবার কখনো একটার পর একটা অ্যাসাইনমেন্ট আর প্র্যাকটিক্যালের চাপ। এই ব্যস্ততার মধ্যে প্রকৃতির মায়ায় হারিয়ে যাওয়ার সুযোগ যেন খুব কম মেলে। অথচ বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের সবুজ-শ্যামল পরিবেশ ক্লান্ত চোখকে একটু শান্তি দিতে সবসময় প্রস্তুত।গবেষণা ও জ্ঞানচর্চায় যেমন দেশের অন্যতম সেরা, সৌন্দর্যের দিক থেকেও বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয় কোনো অংশে কম নয়। প্রাকৃতিক সৌন্দর্যের জন্য এটি “প্রকৃতিকন্যা” নামে খ্যাত। আমবাগান, লিচুবাগান, নারিকেলবাগান, বোটানিক্যাল গার্ডেন, বিজয় একাত্তর।প্রকৃতির সৌন্দর্যের কতশত নিদর্শন ছড়িয়ে আছে পুরো ক্যাম্পাসজুড়ে। আর এসবের সঙ্গে যেন বাড়তি সৌন্দর্য হয়ে আছে ব্রহ্মপুত্র নদ। বিশ্ববিদ্যালয়ের পাশ দিয়ে বয়ে চলা এই নদের তীর শিক্ষার্থীদের কাছে শুধু একটি জায়গা নয় বরং ক্লান্তি ভুলে একটু স্বস্তি নেওয়ার অন্যতম ঠিকানা।
এমনই একদিন ক্লাসের ব্যস্ততার মাঝেই আমরা “মাইটি গ্রুপ-ফাইভ” এর বন্ধুরা মিলে ঠিক করলাম, আজ ব্রহ্মপুত্রের বুকে একটু ঘুরে আসা যাক। সেদিন আকাশ ছিল মেঘলা। মাঝে মাঝে গুঁড়ি গুঁড়ি বৃষ্টি আর মৃদু বাতাসে চারপাশে তৈরি হয়েছিল এক অদ্ভুত মায়াময় পরিবেশ।আমরা এক ঘণ্টার জন্য একটি নৌকা ভাড়া করলাম। সবাই উঠে পড়লাম নৌকায়। মাথার ওপরে মেঘে ঢাকা নীল আকাশ, নিচে নদীর ঢেউ আর চারপাশে মৃদু বাতাস।সব মিলিয়ে মনে হচ্ছিল, ব্যস্ত জীবনের কোলাহল থেকে আমরা যেন হঠাৎ অনেক দূরে চলে এসেছি। ক্লাস, পরীক্ষা আর নানা একাডেমিক চাপের ক্লান্তি মুহূর্তেই কোথায় হারিয়ে গেল।আমরা প্রত্যেকে নিজের মতো করে কিছু খাবার নিয়ে গিয়েছিলাম। নৌকার মধ্যে শুরু হলো একসঙ্গে খাওয়া, গল্প আর আড্ডা। তার সঙ্গে চলতে লাগল গানের কলি। কখনো হাসি, কখনো গল্প, কখনো গান।সব মিলিয়ে সময়টা যেন নিজের গতিতে ছুটে চলছিল।দেখতে দেখতে এক ঘণ্টা শেষ। অথচ কারও মনে যেন তৃপ্তি আসেনি। মনে হচ্ছিল, এই নৌকাটা যদি আরেকটু সময় নদীর বুকে ভেসে থাকত। শেষ পর্যন্ত নৌকার মাঝিকে বলে আরও এক ঘণ্টা সময় বাড়িয়ে নিলাম।এর মধ্যেই হঠাৎ শুরু হলো বৃষ্টি।আকাশ থেকে ঝরে পড়ছে গুঁড়ি গুঁড়ি বৃষ্টি, আর আমরা তখন নদের মাঝখানে। মাথার ওপরে আকাশ, চারপাশে পানি আর সেই বৃষ্টির ফোঁটা, মুহূর্তটা যেন হঠাৎ করে গল্পের মতো হয়ে উঠল। বৃষ্টির মধ্যে নৌকায় বসে আমরা হাসছি, গল্প করছি। বন্ধুত্বের সম্পর্কগুলোও যেন নদীর স্রোতের মতো আরও গভীর হয়ে গেল।আমাদের গল্পের সঙ্গী হয়ে গেলেন নৌকার মাঝিও। তার সঙ্গে গল্প করতে করতে জানলাম তার পরিবার, ছেলে-মেয়ে, কোথায় থাকেন, কীভাবে সংসার চালান ইত্যাদি। একজন অচেনা মানুষও কীভাবে অল্প সময়ের মধ্যে আমাদের আড্ডার অংশ হয়ে যেতে পারেন, সেদিন তা বুঝলাম।
কিন্তু সময় তো কারও জন্য থেমে থাকে না। দেখতে দেখতে দ্বিতীয় ঘণ্টাটাও শেষ হয়ে এলো। মনে হচ্ছিল, সময়কে যদি সত্যিই থামিয়ে রাখা যেত, তাহলে এই মুহূর্তটাকেই থামিয়ে রাখতাম।
শেষ পর্যন্ত নৌকা থেকে আমাদের নামতে হলো। শেষ হলো ছোট্ট সেই নৌকাভ্রমণ। কিন্তু আশ্চর্যের বিষয়, নৌকা থেকে নামার পর মনে হলো ক্লাস, পরীক্ষা আর একাডেমিক ব্যস্ততার সব ক্লান্তি যেন নদীর পানিতে ভেসে গেছে। মনটা অদ্ভুত এক প্রশান্তিতে ভরে উঠল।
বিশ্ববিদ্যালয় জীবনের সৌন্দর্য বোধহয় এখানেই। এই জীবন শুধু ক্লাস, পরীক্ষা, প্র্যাকটিক্যাল আর অ্যাসাইনমেন্টের নয়। এর মাঝেও থাকে বন্ধুত্ব, আড্ডা, হাসি, হঠাৎ নেওয়া কোনো সিদ্ধান্ত, আর প্রকৃতির কাছে গিয়ে কিছুটা সময় নিজেকে খুঁজে পাওয়া। বিশ্ববিদ্যালয় জীবন অনেকটা টক-ঝাল-মিষ্টির মতো। একাডেমিক চাপ যখন জীবনকে অতিষ্ঠ করে তোলে, তখন এমন ছোট্ট একটি বিরতি যেন আবার নতুন করে বাঁচতে শেখায়। আর সেই বিরতির সঙ্গে যদি থাকে প্রিয় বন্ধুরা, মেঘলা আকাশ, গুঁড়ি গুঁড়ি বৃষ্টি আর ব্রহ্মপুত্রের বুক,তাহলে সেই মুহূর্ত স্মৃতির পাতায় থেকে যায় আজীবন। হয়তো কয়েক বছর পর আমরা সবাই বিশ্ববিদ্যালয় ছেড়ে চলে যাব। ক্লাসরুম, হল, প্র্যাকটিক্যাল ল্যাব। সবই তখন স্মৃতি হয়ে যাবে। কিন্তু ব্রহ্মপুত্রের বুকে সেই বৃষ্টিভেজা বিকেল, বন্ধুদের হাসি-আড্ডা আর নৌকার দুলুনির সেই মুহূর্তগুলো থেকে যাবে বিশ্ববিদ্যালয় জীবনের সবচেয়ে সুন্দর গল্পগুলোর একটি হয়ে।
হুর-এ- তানহা তামান্না
০১৭৫৩২৩৯৯২০
৩ সেপ্টেম্বর






























