গৃহহীন ও ভূমিহীন মানুষের আবাসনের ব্যবস্থা করতে সরকারি উদ্যোগে নির্মাণ করা হয়েছিল আশ্রয়ণ প্রকল্পের ঘর। তবে নির্মাণের চার বছর না পেরোতেই গোপালগঞ্জের টুঙ্গিপাড়ার দুটি ইউনিয়নে নির্মিত এসব ঘরের অনেকগুলোই এখন পড়ে আছে পরিত্যক্ত অবস্থায়। কোথাও দরজায় তালা, কোথাও ক্ষতিগ্রস্ত টিনের চাল ও ভাঙা দরজা-জানালা। দীর্ঘদিন মানুষের বসবাস না থাকায় ঘরগুলোর চারপাশ ঢেকে গেছে আগাছা ও ঝোপঝাড়ে।
উপজেলার বর্ণি ও ডুমুরিয়া ইউনিয়নে প্রায় ৩৫ বিঘা খাসজমিতে ২০২১ সালে আশ্রয়ণ প্রকল্পের আওতায় মোট ২৫০টি ঘর নির্মাণ করা হয়। এসব ঘর নির্মাণে সরকারি ব্যয় হয়েছে প্রায় চার কোটি টাকার বেশি। স্থানীয়দের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, বর্তমানে প্রায় ১৫০টি ঘরে পরিবার বসবাস করলেও বাকি ঘরগুলোর অনেকগুলো দীর্ঘদিন ধরে খালি পড়ে রয়েছে।
মঙ্গলবার (১১ আগস্ট) সরেজমিনে প্রকল্প এলাকা ঘুরে দেখা যায়, বেশ কিছু ঘরের চারপাশে ঘন হয়ে উঠেছে আগাছা ও ঝোপঝাড়। কয়েকটি ঘরের টিনের চাল ক্ষতিগ্রস্ত হয়ে পড়েছে। কোথাও নষ্ট হয়েছে দরজা-জানালা। আবার অনেক ঘরের দরজায় ঝুলছে তালা। দীর্ঘদিন ব্যবহার না হওয়ায় কিছু ঘরকে দূর থেকে পরিত্যক্ত স্থাপনার মতো মনে হচ্ছে।
স্থানীয় বাসিন্দাদের অভিযোগ, আশ্রয়ণ প্রকল্প বাস্তবায়নের সময় জায়গা নির্বাচন এবং সুবিধাভোগী বাছাইয়ে যথেষ্ট পরিকল্পনা করা হয়নি। এর ফলে ঘর বরাদ্দ পাওয়ার পরও অনেকে সেখানে বসবাস করছেন না। স্থানীয়দের দাবি, কেউ কেউ বরাদ্দ পাওয়া ঘর অন্যের কাছে অর্থের বিনিময়ে হস্তান্তর বা বিক্রি করে দিয়েছেন। আবার কিছু ঘর ভাড়া দেওয়ার অভিযোগও রয়েছে।
তাদের মতে, এভাবে ঘর খালি পড়ে থাকায় একদিকে সরকারি অর্থে নির্মিত স্থাপনাগুলো নষ্ট হচ্ছে, অন্যদিকে প্রকৃত গৃহহীন ও ভূমিহীন পরিবারগুলো আবাসনের সুযোগ থেকে বঞ্চিত হচ্ছে।
স্থানীয়দের আরও অভিযোগ, দীর্ঘদিন ধরে ফাঁকা থাকা কয়েকটি ঘরে রাতের বেলায় মাদকসেবীদের আড্ডা বসে। এতে প্রকল্প এলাকার পরিবেশ ও নিরাপত্তা নিয়ে আশপাশের বাসিন্দাদের মধ্যে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে।
তাদের দাবি, খালি পড়ে থাকা ঘরগুলো দ্রুত সংস্কার করে প্রকৃত ভূমিহীন ও গৃহহীন পরিবারের মধ্যে বরাদ্দ দেওয়া হোক। প্রয়োজনে যেসব ঘর বসবাসের উপযোগী নয় বা কোনো কারণে পুনর্বাসন সম্ভব হচ্ছে না, সেগুলো জনকল্যাণমূলক কাজে ব্যবহারের উদ্যোগ নেওয়া যেতে পারে।
এ বিষয়ে টুঙ্গিপাড়া উপজেলা ভূমি অফিসের মো. আলামিন হালদার জানান, আশ্রয়ণ প্রকল্পের ঘর বরাদ্দ পাওয়ার পরও যারা সেখানে বসবাস করছেন না, তাদের তালিকা তৈরির উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। যাচাই-বাছাইয়ের পর প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
প্রশাসনের পক্ষ থেকে আরও জানানো হয়েছে, বরাদ্দ পাওয়ার পর যারা প্রকল্পের ঘরে বসবাস করছেন না, যাচাই শেষে তাদের বরাদ্দ বাতিল করে প্রকৃত ভূমিহীন ও গৃহহীন পরিবারকে পুনর্বাসনের উদ্যোগ নেওয়া হবে।
সরকারি অর্থে নির্মিত আশ্রয়ণ প্রকল্পের মূল লক্ষ্য ছিল ভূমিহীন ও গৃহহীন মানুষের জন্য নিরাপদ আবাসন নিশ্চিত করা। কিন্তু নির্মাণের কয়েক বছরের মধ্যেই যদি উল্লেখযোগ্যসংখ্যক ঘর তালাবদ্ধ ও পরিত্যক্ত হয়ে পড়ে, তাহলে প্রকল্পের উদ্দেশ্য বাস্তবায়ন নিয়ে প্রশ্ন ওঠা স্বাভাবিক।
স্থানীয়দের প্রত্যাশা, দ্রুত খালি ঘরগুলোর সঠিক তালিকা তৈরি, সুবিধাভোগীদের পুনঃযাচাই, প্রয়োজনীয় সংস্কার এবং প্রকৃত উপকারভোগীদের বসবাস নিশ্চিত করা হবে। পাশাপাশি কেন বরাদ্দ পাওয়া পরিবারগুলো ঘরে থাকছে না, সেই কারণগুলো চিহ্নিত করে কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়া হবে। এতে সরকারি সম্পদের অপচয় কমার পাশাপাশি আশ্রয়ণ প্রকল্পের মূল উদ্দেশ্যও বাস্তবায়িত হবে।

























