ময়মনসিংহের ঈশ্বরগঞ্জ উপজেলার মগটুলা ইউনিয়নের বৈরাটি সিনিয়র আলিম মাদ্রাসায় এবারের দাখিল পরীক্ষার ফলাফলে নেমে এসেছে চরম বিপর্যয়।
প্রতিষ্ঠানটির ২০ জন শিক্ষক-কর্মচারীর বিপরীতে পরীক্ষায় অংশ নেওয়া ১২ জন শিক্ষার্থীর একজনও পাস করতে পারেনি। ফলে পাসের হার দাঁড়িয়েছে শূন্য শতাংশে। এ ঘটনায় প্রতিষ্ঠানের পাঠদানের মান, শিক্ষার্থীদের উপস্থিতি ও পড়াশোনায় আগ্রহের পাশাপাশি অভিভাবকদের তদারকি ও সামগ্রিক একাডেমিক ব্যবস্থাপনা নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে।
তবে এই ফলাফলকে শুধু শিক্ষকদের ব্যর্থতা হিসেবে দেখলে পুরো চিত্রটি পাওয়া যাবে না। কারণ একজন শিক্ষার্থীর ফলাফল তৈরি হয় শ্রেণিকক্ষের পাঠদান, নিয়মিত উপস্থিতি, বাড়িতে পড়াশোনা, অভিভাবকের তদারকি, শিক্ষার্থীর নিজস্ব আগ্রহ এবং পারিপার্শ্বিক সামাজিক পরিবেশের সম্মিলিত প্রভাবের নিয়ামকের উপর।
উপজেলা মাধ্যমিক শিক্ষা কর্মকর্তার কার্যালয় সূত্রে জানা গেছে, চলতি বছর ঈশ্বরগঞ্জ উপজেলার ২৩টি মাদ্রাসা থেকে মোট ৮৯৭ জন শিক্ষার্থী দাখিল পরীক্ষায় অংশ নেয়। এর মধ্যে উত্তীর্ণ হয়েছে ৪০৭ জন। জিপিএ-৫ পেয়েছে তিনজন। মাদ্রাসা পর্যায়ে উপজেলায় গড় পাসের হার ৪৫ দশমিক ৩৭ শতাংশ।
অন্যদিকে বৈরাটি সিনিয়র আলিম মাদ্রাসার ১২ পরীক্ষার্থীর সবাই অকৃতকার্য হওয়ায় প্রতিষ্ঠানটির পাসের হার দাঁড়িয়েছে শূন্য শতাংশে।
উপজেলার গড় ফলাফলের তুলনায় এই ব্যর্থতা তাই শুধু একটি পরিসংখ্যান নয়; বরং প্রতিষ্ঠানটির শিক্ষা কার্যক্রম নিয়ে গভীরভাবে পর্যালোচনার প্রয়োজনীয়তার ইঙ্গিতও দিচ্ছে।
ফল বিপর্যয়ের কারণ জানতে চাইলে মাদ্রাসার অধ্যক্ষ মো. শাহজাহান বলেন, শিক্ষার্থীরা নিয়মিত মাদ্রাসায় আসত না। মাদ্রাসার পক্ষ থেকে চেষ্টা করা হয়েছে। তবে অতীতে শিক্ষক সংকট ও অবকাঠামোগত সমস্যাও ছিল।
তিনি জানান, সম্প্রতি শিক্ষক নিয়োগ হয়েছে। আগামী বছর থেকে ভালো ফলাফলের জন্য প্রয়োজনীয় সব উদ্যোগ নেওয়া হবে।
অধ্যক্ষের বক্তব্যে শিক্ষার্থীদের অনিয়মিত উপস্থিতির বিষয়টি বিশেষভাবে সামনে এসেছে। আর শিক্ষার্থীর নিয়মিত উপস্থিতি নিশ্চিত করা শুধু প্রতিষ্ঠানের দায়িত্ব নয়; এর সঙ্গে পরিবার ও অভিভাবকের দায়িত্বও সরাসরি জড়িত।
একজন শিক্ষার্থী নিয়মিত মাদ্রাসায় যাচ্ছে কি না, ক্লাসে মনোযোগ দিচ্ছে কি না, বাড়িতে পড়াশোনা করছে কি না—এসব বিষয়ে অভিভাবকের নিয়মিত নজরদারি না থাকলে শিক্ষার্থীর অনিয়ম ধীরে ধীরে অভ্যাসে পরিণত হতে পারে।
একজন শিক্ষার্থীর ফলাফল শুধু শ্রেণিকক্ষে তৈরি হয় না। শ্রেণিকক্ষের পাঠদানের পাশাপাশি বাড়িতে পড়াশোনা, পাঠ পুনরাবৃত্তি, বাড়ির কাজ সম্পন্ন করা এবং পরীক্ষার প্রস্তুতিও সমান গুরুত্বপূর্ণ।
ক্লাসে অনিয়মিত উপস্থিতির কারণে শিক্ষার্থীর পাঠের ধারাবাহিকতা নষ্ট হয়। একটি অধ্যায়ের সঙ্গে পরবর্তী অধ্যায়ের সম্পর্ক বুঝতে সমস্যা হয়। পরে পরীক্ষার আগে অল্প সময়ে বড় পরিমাণ পাঠ শেষ করার চেষ্টা করলেও কাঙ্ক্ষিত প্রস্তুতি নেওয়া কঠিন হয়ে পড়ে।
এখানে অভিভাবকের ভূমিকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। সন্তান নিয়মিত শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে যাচ্ছে কি না, বাড়িতে পড়ছে কি না, কোনো বিষয়ে পিছিয়ে পড়ছে কি না—এসব বিষয়ে নিয়মিত খোঁজ নেওয়া অভিভাবকের দায়িত্ব।
অভিভাবকের এই তদারকি দুর্বল হলে শিক্ষার্থীর অনিয়ম সহজেই দীর্ঘস্থায়ী হতে পারে।
বর্তমান সময়ে শিক্ষার্থীদের পড়াশোনায় মনোযোগ কমে যাওয়ার পেছনে মোবাইল ফোন, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ও ডিজিটাল বিনোদনের অতিরিক্ত ব্যবহারও একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়।
প্রযুক্তি শিক্ষার সহায়ক হওয়ার কথা থাকলেও এর অনিয়ন্ত্রিত ব্যবহার শিক্ষার্থীর মূল্যবান সময় কেড়ে নিতে পারে। দীর্ঘ সময় মোবাইল ব্যবহার, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ব্যস্ততা কিংবা বিনোদনে অতিরিক্ত সময় ব্যয় পড়াশোনার প্রতি মনোযোগ কমিয়ে দিতে পারে।
এ ক্ষেত্রেও পরিবারের ভূমিকা সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ। সন্তান মোবাইল কী কাজে ব্যবহার করছে, কত সময় ব্যবহার করছে এবং পড়াশোনার সময় যথাযথভাবে দিচ্ছে কি না—এসব বিষয়ে অভিভাবকের সচেতন নজরদারি প্রয়োজন।
শিক্ষক পড়ালেই একজন শিক্ষার্থী ভালো ফল করবে—এমন নিশ্চয়তা নেই। শেখার জন্য শিক্ষার্থীর নিজের আগ্রহ, অধ্যবসায় ও নিয়মিত অনুশীলন অপরিহার্য।
শ্রেণিকক্ষে পড়ানো বিষয় বাড়িতে পুনরাবৃত্তি না করা, বাড়ির কাজ না করা, দুর্বল বিষয় নিয়ে শিক্ষকের সহায়তা না নেওয়া এবং পরীক্ষার আগে হঠাৎ প্রস্তুতি নেওয়ার প্রবণতা ফলাফলে নেতিবাচক প্রভাব ফেলে।
তাই কোনো প্রতিষ্ঠানের ফলাফল বিশ্লেষণের সময় শুধু শিক্ষক কত ঘণ্টা ক্লাস নিয়েছেন, সেটি দেখলেই হবে না। শিক্ষার্থী কতদিন ক্লাস করেছে, কতটা পড়েছে এবং পরিবার তাকে কতটা সহযোগিতা করেছে—সেসব প্রশ্নও সামনে আনতে হবে।
শিক্ষার্থীর শিক্ষা শুধু মাদ্রাসার চার দেয়ালের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। তার পারিবারিক পরিবেশ, বন্ধুদের প্রভাব, সামাজিক মূল্যবোধ এবং ভবিষ্যৎ নিয়ে পরিবারের প্রত্যাশাও শিক্ষাজীবনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে।
একজন শিক্ষার্থী যদি পড়াশোনার চেয়ে অন্য কাজে বেশি আগ্রহী হয়ে ওঠে এবং পরিবার ও সমাজ তাকে শিক্ষার পথে ধরে রাখার ক্ষেত্রে কার্যকর ভূমিকা না রাখে, তাহলে শুধু শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের ওপর দায় চাপিয়ে সমস্যার সমাধান করা কঠিন।
তবে অভিভাবকদের দায়ের কথা বললেই শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের দায়িত্ব কমে যায় না। বরং ১২ জন পরীক্ষার্থীর সবাই অকৃতকার্য হওয়ার ঘটনায় প্রতিষ্ঠানটির একাডেমিক ব্যবস্থাপনাও গভীরভাবে পর্যালোচনা করা প্রয়োজন।
শিক্ষার্থীরা নিয়মিত ক্লাসে না এলে তাদের অভিভাবকদের সঙ্গে কতবার যোগাযোগ করা হয়েছে, অনুপস্থিত শিক্ষার্থীদের বিষয়ে কী ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে, দুর্বল শিক্ষার্থীদের আলাদাভাবে শনাক্ত করা হয়েছিল কি না, বিশেষ ক্লাস বা অতিরিক্ত অনুশীলনের ব্যবস্থা ছিল কি না—এসব প্রশ্নের উত্তরও খুঁজে দেখা দরকার।
একই সঙ্গে নিয়মিত মূল্যায়ন, শ্রেণিকক্ষ পর্যবেক্ষণ এবং শিক্ষার্থীদের অগ্রগতি নিয়ে শিক্ষকদের মধ্যে সমন্বয় কতটা ছিল, সেটিও গুরুত্বপূর্ণ।
২০ জন শিক্ষক থাকার পরও ১২ জন পরীক্ষার্থীর সবাই অকৃতকার্য হওয়ার বিষয়ে জানতে চাইলে অধ্যক্ষ মো. শাহজাহান বিষয়টিকে ‘লজ্জার কথা’ উল্লেখ করেন এবং অধ্যক্ষ তার বক্তব্যে শিক্ষার্থীদের অনিয়মিত উপস্থিতির বিষয়টি উঠিয়ে আনেন। কিন্তু সেই অনুপস্থিতি ঠেকাতে অভিভাবকদের সঙ্গে নিয়মিত যোগাযোগ, বিশেষ ক্লাস, দুর্বল শিক্ষার্থী চিহ্নিতকরণ এবং পরীক্ষার আগে বিশেষ প্রস্তুতির উদ্যোগ কতটা নেওয়া হয়েছিল—সেটিও অনুসন্ধানের দাবি রাখে।
মাদ্রাসাটিতে শিক্ষক সংখ্যা, শিক্ষার্থীদের উপস্থিতির হার, পাঠদানের পরিবেশ এবং ফল বিপর্যয়ের কারণ সম্পর্কে উপজেলা মাধ্যমিক শিক্ষা কর্মকর্তা মো. আশরাফুল ইসলামের বক্তব্য জানতে তাঁর ব্যবহৃত মুঠোফোন নম্বরে একাধিকবার যোগাযোগের চেষ্টা করা হয়। তবে নম্বরটি বন্ধ থাকায় তাঁর বক্তব্য পাওয়া যায়নি।
বৈরাটি সিনিয়র আলিম মাদ্রাসার শূন্য পাসের হার নিঃসন্দেহে উদ্বেগজনক। ২০ জন শিক্ষক থাকার পরও ১২ জন পরীক্ষার্থীর একজনও উত্তীর্ণ না হওয়া প্রতিষ্ঠানটির একাডেমিক ব্যবস্থাপনা নিয়ে প্রশ্ন তোলার যথেষ্ট কারণ তৈরি করেছে।
কিন্তু একই সঙ্গে এটিও সত্য যে শিক্ষার্থীরা যদি নিয়মিত মাদ্রাসায় না আসে, বাড়িতে পড়াশোনা না করে, পরীক্ষার প্রস্তুতি না নেয় এবং পরিবার তাদের শিক্ষাজীবনের প্রতি যথাযথ নজর না রাখে, তাহলে শুধু শিক্ষকদের ওপর পুরো দায় চাপানো বাস্তবসম্মত নয়।
বিশেষ করে শিক্ষার্থীদের নিয়মিত উপস্থিতি ও পড়াশোনার অভ্যাস গড়ে তোলার ক্ষেত্রে পরিবারের ভূমিকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। সন্তান প্রতিদিন কোথায় যাচ্ছে, কী করছে, কতক্ষণ পড়ছে, কতক্ষণ মোবাইল ব্যবহার করছে—এসবের প্রথম পর্যায়ের নজরদারি পরিবারেরই করার কথা।
অতএব সম্মিলিত দায়ের প্রশ্নে অভিভাবকদের দায়িত্বকে কোনোভাবেই খাটো করে দেখার সুযোগ নেই; বরং শিক্ষার্থীর দৈনন্দিন শিক্ষা-অভ্যাস গড়ে তোলায় তাদের দায় অনেক ক্ষেত্রে সবচেয়ে প্রত্যক্ষ। একই সঙ্গে প্রতিষ্ঠানকে তার একাডেমিক তদারকি, শিক্ষকতার মান, উপস্থিতি পর্যবেক্ষণ ও দুর্বল শিক্ষার্থীদের জন্য সহায়ক ব্যবস্থা নিশ্চিত করতে হবে এবং শিক্ষার্থীকেও নিজের পড়াশোনার প্রতি দায়িত্বশীল হতে হবে।
কারণ ফলাফল বিপর্যয় সাধারণত একদিনে তৈরি হয় না। দীর্ঘদিনের অনিয়ম, অনাগ্রহ, তদারকির ঘাটতি, পারিবারিক উদাসীনতা, সামাজিক পরিবেশ এবং প্রাতিষ্ঠানিক দুর্বলতার সম্মিলিত প্রভাবেই এমন ফলাফল তৈরি হয়।
তাই বৈরাটি সিনিয়র আলিম মাদ্রাসার শূন্য পাসের হারকে কাউকে এককভাবে দোষারোপের হাতিয়ার না বানিয়ে সবার জন্য একটি সতর্কবার্তা হিসেবে দেখা জরুরি।
শিক্ষককে জবাবদিহির আওতায় আনতে হবে, শিক্ষার্থীকে দায়িত্বশীল হতে হবে, প্রতিষ্ঠানকে কার্যকর একাডেমিক তদারকি নিশ্চিত করতে হবে—আর সবচেয়ে আগে অভিভাবককে সন্তানের শিক্ষাজীবনের প্রতি দায়িত্বশীল হতে হবে।
কারণ একটি শিক্ষার্থীর সাফল্য যেমন একার নয়, তেমনি তার ব্যর্থতার দায়ও একক কারও নয়।

























