ময়মনসিংহের ঈশ্বরগঞ্জে আত্মহত্যার ঘটনা ঘটছে নিয়মিত। কেউ বিষপানে, আবার কেউ ফাঁস দিয়ে জীবন শেষ করছেন। আবার অনেকে আত্মহত্যাচেষ্টা করে হাসপাতালে চিকিৎসা নিচ্ছেন। কিন্তু সরকারি নথিতে এসব ঘটনার পুরো চিত্র উঠে আসছে না। স্থানীয় জনপ্রতিনিধিকে জানিয়ে অনেক মরদেহ দাফন বা সৎকারের অভিযোগ রয়েছে। থানায় অপমৃত্যু মামলা না হওয়ায় এসব মৃত্যুর হিসাব থেকে যাচ্ছে নথির বাইরে।
ঈশ্বরগঞ্জ থানার তথ্য বলছে, চলতি বছরের ১ জানুয়ারি থেকে ৩১ আগস্ট পর্যন্ত আট মাসে থানায় ১৩টি অপমৃত্যু মামলা হয়েছে। এর মধ্যে পুরুষের সংখ্যা বেশি। থানার হিসাবে, ১৫ থেকে ৩০ বছর বয়সী মানুষের মধ্যে আত্মহত্যার প্রবণতা বেশি। অন্যদিকে উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের তথ্য বলছে, প্রতি মাসে গড়ে ৮ থেকে ১০ জন আত্মহত্যার চেষ্টা কিংবা আত্মহত্যাজনিত কারণে হাসপাতালে চিকিৎসা নিতে আসেন। তাদের মধ্যে বিষপান করা রোগীর সংখ্যা বেশি। তবে ফাঁস দিয়ে আত্মহত্যার চেষ্টা বা এ ধরনের রোগীর সংখ্যা তুলনামূলক কম। হাসপাতাল কর্তৃপক্ষের হিসাবে, ১৩ থেকে ১৯ বছর এবং ৫০ বছর বা তার বেশি বয়সীদের মধ্যে আত্মহত্যার প্রবণতা বেশি। এসব রোগীর মধ্যে গড়ে মাসে দুজনের মৃত্যু হয় বলে জানিয়েছে হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ।
এদিকে আত্মহত্যার সাম্প্রতিক ঘটনাগুলোর একটি ঘটেছে এসএসসি (দাখিল) পরীক্ষার ফল প্রকাশের আগেই। আশানুরূপ পরীক্ষা দিতে না পারায় অকৃতকার্য হওয়ার আশঙ্কায় মাহিয়া সুলতানা মাহি নামে এক শিক্ষার্থী আত্মহত্যা করে। গত ২৩ জুলাই দুপুর ২টার দিকে ঈশ্বরগঞ্জ পৌর শহরের কাকনহাটি গ্রাম থেকে তার মরদেহ উদ্ধার করে পুলিশ। এ ঘটনার আগে-পরে আরও কয়েকটি আত্মহত্যার ঘটনা ঘটেছে উপজেলার বিভিন্ন এলাকায়। সর্বশেষ গত ২৭ আগস্ট ভোর ৫টার দিকে আঠারবাড়ী ইউনিয়নের রামপুর গ্রামের কাকন মিয়া নামে পঞ্চাশোর্ধ্ব এক ব্যক্তি বিষপানে আত্মহত্যা করেন।
জানা গেছে, চলতি বছরের গত আট মাসে থানায় ১৩টি অপমৃত্যু মামলা হয়েছে। অন্যদিকে উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে মাসে ৮-১০ জনের আত্মহত্যার চেষ্টা বা আত্মহত্যাজনিত কারণে চিকিৎসা নেওয়ার তথ্য জানা যায়। যাতে করে অপমৃত্যুর সংখ্যায় বড় ধরনের পার্থক্য দেখা যাচ্ছে। হাসপাতালের হিসাব অনুযায়ী, আট মাসে আত্মহত্যার চেষ্টা বা এ-সংক্রান্ত কারণে চিকিৎসা নিতে আসা মানুষের সংখ্যা ৬৪ থেকে ৮০ জনের মতো। তবে হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ জানায়, আত্মহত্যার চেষ্টা করা এসব রোগীর মধ্যে বিষপানের অধিকাংশ রোগীই চিকিৎসা শেষে সুস্থ হয়ে বর্তমানে স্বাভাবিক জীবনযাপন করছেন।
সংশ্লিষ্টরা বলছেন, থানায় অপমৃত্যু মামলা ও হাসপাতালের চিকিৎসা নেওয়া মানুষের সংখ্যা—এ দুটি তথ্যই ঈশ্বরগঞ্জে আত্মহত্যার ঝুঁকির উদ্বেগজনক চিত্র তুলে ধরছে। স্থানীয়দের অভিযোগ, অনেক ক্ষেত্রে আত্মহত্যার ঘটনা ঘটলেও পুলিশকে না জানিয়ে স্থানীয় চেয়ারম্যান বা ইউপি সদস্যকে অবহিত করে মরদেহ দাফন বা সৎকার করা হয়। এসব ঘটনায় অপমৃত্যু মামলা না হওয়ায় সরকারি হিসাবেও তা উঠে আসে না।
অন্যদিকে বিশ্বব্যাপী আত্মহত্যা প্রতিরোধে সচেতনতা তৈরির জন্য প্রতি বছর ১০ সেপ্টেম্বর বিশ্ব আত্মহত্যা প্রতিরোধ দিবস পালন করা হয়। আত্মহত্যা প্রতিরোধে মানসিক স্বাস্থ্য নিয়ে খোলামেলা আলোচনা, ঝুঁকিতে থাকা ব্যক্তিকে শনাক্ত করা, কাউন্সেলিং এবং পরিবার ও সমাজের সচেতনতা বাড়ানোর ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়। এ ক্ষেত্রে স্থানীয়দের অভিযোগ, ঈশ্বরগঞ্জে আত্মহত্যা প্রতিরোধে নিয়মিত ও দৃশ্যমান কোনো সচেতনতামূলক কর্মসূচি নেই। তারা বলছেন, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, ইউনিয়ন ও ওয়ার্ড পর্যায়ে মানসিক স্বাস্থ্য নিয়ে আলোচনা বা কাউন্সেলিংয়ের উদ্যোগও চোখে পড়ে না। ফলে পরীক্ষার ফল, পারিবারিক দ্বন্দ্ব, সম্পর্কের টানাপোড়েন, আর্থিক সংকট কিংবা হতাশার মতো পরিস্থিতিতে কিশোর-কিশোরী ও তরুণদের মানসিক চাপ মোকাবিলায় সহায়তা পাওয়ার সুযোগ সীমিত।
ঈশ্বরগঞ্জ থানার ওসি সাজ্জাদ রোমন বলেন, চলতি বছরের ১ জানুয়ারি থেকে ৩১ আগস্ট পর্যন্ত ঈশ্বরগঞ্জ থানায় ১৩টি অপমৃত্যু মামলা হয়েছে। করোনা মহামারির সময় আত্মহত্যার প্রবণতা বেড়েছিল, যার প্রভাব এখনো রয়েছে।


























