ঢাকা , বুধবার, ০১ জুলাই ২০২৬, ১৭ আষাঢ় ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ
শিরোনাম ::
দীঘিনালায় ব্রিজ না থাকায় শতাধিক শিক্ষার্থীর পারাপারের ভোগান্তি বেনাপোল সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে জীবনের ঝুঁকি নিয়ে পরিত্যক্ত ভবনে ক্লাস করছে শিক্ষার্থীরা রাজশাহী মেট্রোপলিটন পুলিশের ৩৪ তম প্রতিষ্ঠাবার্ষিকীর শুভ উদ্বোধন রুয়েটে বৃক্ষরোপণ কর্মসূচির উদ্বোধন করলেন রাসিক প্রশাসক দিনাজপুরে ৪ হাজার ২৫০ প্রান্তিক কৃষকের মাঝে বিনামূল্যে বীজ, সার ও গাছের চারা বিতরণ আওয়ামী লীগ নৈরাজ্যের প্রতিবাদে সিরাজগঞ্জে বিক্ষোভ মিছিল নাগরপুরে পাট ক্ষেত থেকে অর্ধগলিত লাশ উদ্ধার, তদন্তে পুলিশ আত্রাইয়ে দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও ত্রাণ মন্ত্রণালয়ের মানবিক সহায়তার চাল বিতরণ চিরিরবন্দরে সন্ধ্যা নামলেই মাদকের বিষাক্ত ছোবলে জর্জরিত দুদক চেয়ারম্যান ও কমিশনার নিয়োগ: সার্চ কমিটির বৈঠক আজ

চিরিরবন্দরে সন্ধ্যা নামলেই মাদকের বিষাক্ত ছোবলে জর্জরিত

  • Reporter Name
  • আপডেট সময় ০৯:৪১:৪৩ পূর্বাহ্ন, বুধবার, ১ জুলাই ২০২৬
  • ১৪ বার পড়া হয়েছে

মো: সাব্বির হোসেন চিরিরবন্দর দিনাজপুর প্রতিনিধি:

দিনাজপুরের চিরিরবন্দর উপজেলায় একসময় সন্ধ্যা নামলেই গ্রামের চায়ের দোকানগুলোতে জমে উঠত প্রাণবন্ত আড্ডা। মাঠে ছুটোছুটি করত কিশোরেরা, বাজারের মোড়ে বসে গল্পে মেতে থাকতেন প্রবীণরা। সেই পরিচিত গ্রামীণ চিত্র আজ অনেকটাই বদলে গেছে। সন্ধ্যার পর অনেক এলাকায় নেমে আসে অস্বস্তিকর নীরবতা; অন্ধকারের আড়ালে সক্রিয় হয়ে ওঠে মাদক কারবার। উদ্বিগ্ন অভিভাবক, আতঙ্কিত শিক্ষক ও সচেতন নাগরিকদের কাছে মাদক এখন কেবল অপরাধ নয়—এটি ভবিষ্যৎ প্রজন্মকে গ্রাস করা এক ভয়াবহ সামাজিক ব্যাধি।

বর্তমানে ভয়াবহ মাদক আগ্রাসনের মুখোমুখি। একসময় সীমিত পরিসরে থাকা গাঁজা, ফেনসিডিল ও চোলাই মদ এখন ছড়িয়ে পড়েছে প্রায় প্রতিটি ইউনিয়নে। নতুন করে যুক্ত হয়েছে ইয়াবার মতো মরণনেশা। সহজলভ্যতা ও দ্রুত বিস্তারের কারণে সমাজের নানা শ্রেণি-পেশার মানুষ এই নেশার জালে জড়িয়ে পড়ছে।

স্থানীয়দের ভাষ্য অনুযায়ী,চিরিরবন্দর উপজেলার বিভিন্ন গ্রাম ও বাজারকেন্দ্র ঘিরে ধীরে ধীরে গড়ে উঠেছে একটি বিস্তৃত মাদক নেটওয়ার্ক। জয়পুর বাজার থেকে শুরু করে ৯নং ভিয়াইল ইউনিয়ন খেড়কাটি বাজার আমতলী বাজার তুলসীপুর গমিরাহাট বাজার এলাকায় মাদক কেনাবেচার অভিযোগ রয়েছে

অভিযোগ আছে, মোটরসাইকেল ও ইজিবাইক ব্যবহার করে ভ্রাম্যমাণ বিক্রেতারা গ্রাহকের কাছে সরাসরি মাদক পৌঁছে দিচ্ছে। ফলে নির্দিষ্ট বিক্রয়কেন্দ্র চিহ্নিত করা কঠিন হয়ে পড়ছে। অনেক সময় স্থানীয় পর্যায়ে তথ্য ফাঁস হয়ে যাওয়ায় অভিযানের আগেই কারবারিরা সতর্ক হয়ে যায়। আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর উপস্থিতি টের পেয়েই তারা দ্রুত মাদক সরিয়ে ফেলার সুযোগ পাচ্ছে।

মাদকের ভয়াবহ প্রভাব এখন আর কোনো একটি শ্রেণির মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই। দিনমজুর, ব্যবসায়ী, বেকার যুবক থেকে শুরু করে শিক্ষার্থীরাও এই সংকটে জড়িয়ে পড়ছে। বিশেষ করে তরুণদের মধ্যে ইয়াবা ও গাঁজার ব্যবহার উদ্বেগজনক হারে বেড়েছে। শিক্ষক ও অভিভাবকদের মতে, স্কুল-কলেজপড়ুয়া শিক্ষার্থী ও উঠতি বয়সী তরুণদের একটি অংশ খুব সহজেই মাদকের সংস্পর্শে চলে যাচ্ছে। কৌতূহল, বন্ধুদের প্রভাব ও বেকারত্ব তাদের এই অন্ধকার পথে ঠেলে দিচ্ছে।

অনুসন্ধানে জানা গেছে, তুলনামূলক বেশি দামের কারণে ফেনসিডিলের ব্যবহার দেখা যাচ্ছে কিছুটা সচ্ছল শ্রেণির মধ্যে। অন্যদিকে ইয়াবা, গাঁজা ও চোলাই মদের কম দাম ও সহজলভ্যতার কারণে নিম্ন ও মধ্যবিত্ত শ্রেণির মানুষের মধ্যেই এসব নেশার বিস্তার বেশি।

গত এক বছরে চিরিরবন্দর থানা পুলিশ, মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তর ও ভ্রাম্যমাণ আদালতের একাধিক অভিযানে বেশ কয়েকজন মাদক ব্যবসায়ী ও সেবনকারী গ্রেপ্তার হয়েছে। উদ্ধার করা হয়েছে ইয়াবা, গাঁজা ও অন্যান্য মাদকদ্রব্য। বিভিন্ন সময়ে কারাদণ্ড ও অর্থদণ্ডও দেওয়া হয়েছে। তবে স্থানীয়দের প্রশ্ন থেকেই যাচ্ছে—কেন বারবার ধরা পড়ছে খুচরা বিক্রেতারাই? মাদকের মূল হোতারা কিংবা বড় চালান নিয়ন্ত্রণকারী সিন্ডিকেট কীভাবে আইনের বাইরে থেকে যাচ্ছে?

স্থানীয় সবুজ ইসলাম বলেন, “ছোটখাটো বিক্রেতাদের গ্রেপ্তার করা হলেও বড় মাদক ব্যবসায়ীদের বিরুদ্ধে দৃশ্যমান ব্যবস্থা খুব কম দেখা যায়। ফলে কিছুদিন পরিস্থিতি শান্ত থাকলেও পরে আবার একইভাবে মাদক কারবার শুরু হয়।”

শিক্ষক মো. মাসুদ রহমান বলেন, “মাদক শুধু একজন মানুষকে নয়; একটি পরিবার ও পুরো সমাজকে ধ্বংস করে। শিক্ষার্থীদের মধ্যে সচেতনতা বাড়ানো এবং সরবরাহকারীদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা না নিলে ভবিষ্যৎ প্রজন্ম ভয়াবহ সংকটে পড়বে।”

সমাজকর্মীদের মতে, মাদকের বিস্তার এখন আর কেবল আইনশৃঙ্খলার বিষয় নয়; এটি একটি গভীর সামাজিক সংকট। পরিবার, শিক্ষা প্রতিষ্ঠান, ধর্মীয় সংগঠন, জনপ্রতিনিধি ও সামাজিক সংগঠনগুলোকে একযোগে কাজ করতে হবে। পাশাপাশি তরুণদের খেলাধুলা, সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ড ও কর্মসংস্থানের সঙ্গে যুক্ত করার ওপর গুরুত্বারোপ করেন তারা।

এ বিষয়ে চিরিরবন্দর থানার অফিসার ইনচার্জ (ওসি) মাহামুদুল-নবী বলেন, “মাদকের বিরুদ্ধে নিয়মিত ও ধারাবাহিক অভিযান পরিচালনা করা হচ্ছে। গোয়েন্দা নজরদারি বাড়ানো হয়েছে। তথ্যভিত্তিক অভিযানের মাধ্যমে মাদক সংশ্লিষ্ট সবাইকে আইনের আওতায় আনা হবে। কোনো মাদক কারবারিকেই ছাড় দেওয়া হবে না।”

একসময় শান্ত ও সৌহার্দ্যের জনপদ হিসেবে পরিচিত চিরিরবন্দর আজ মাদকের বিষাক্ত ছোবলে উদ্বিগ্ন। প্রশ্ন একটাই—সমাজের সব স্তরের মানুষ একসঙ্গে না জাগলে কি এই অন্ধকার থেকে মুক্তি মিলবে? এখনই কার্যকর উদ্যোগ না নিলে আগামী প্রজন্মের জন্য আরও কঠিন বাস্তবতা অপেক্ষা করছে বলেই মনে করছেন সচেতন মহল।

ট্যাগস
জনপ্রিয় সংবাদ

দীঘিনালায় ব্রিজ না থাকায় শতাধিক শিক্ষার্থীর পারাপারের ভোগান্তি

চিরিরবন্দরে সন্ধ্যা নামলেই মাদকের বিষাক্ত ছোবলে জর্জরিত

আপডেট সময় ০৯:৪১:৪৩ পূর্বাহ্ন, বুধবার, ১ জুলাই ২০২৬

মো: সাব্বির হোসেন চিরিরবন্দর দিনাজপুর প্রতিনিধি:

দিনাজপুরের চিরিরবন্দর উপজেলায় একসময় সন্ধ্যা নামলেই গ্রামের চায়ের দোকানগুলোতে জমে উঠত প্রাণবন্ত আড্ডা। মাঠে ছুটোছুটি করত কিশোরেরা, বাজারের মোড়ে বসে গল্পে মেতে থাকতেন প্রবীণরা। সেই পরিচিত গ্রামীণ চিত্র আজ অনেকটাই বদলে গেছে। সন্ধ্যার পর অনেক এলাকায় নেমে আসে অস্বস্তিকর নীরবতা; অন্ধকারের আড়ালে সক্রিয় হয়ে ওঠে মাদক কারবার। উদ্বিগ্ন অভিভাবক, আতঙ্কিত শিক্ষক ও সচেতন নাগরিকদের কাছে মাদক এখন কেবল অপরাধ নয়—এটি ভবিষ্যৎ প্রজন্মকে গ্রাস করা এক ভয়াবহ সামাজিক ব্যাধি।

বর্তমানে ভয়াবহ মাদক আগ্রাসনের মুখোমুখি। একসময় সীমিত পরিসরে থাকা গাঁজা, ফেনসিডিল ও চোলাই মদ এখন ছড়িয়ে পড়েছে প্রায় প্রতিটি ইউনিয়নে। নতুন করে যুক্ত হয়েছে ইয়াবার মতো মরণনেশা। সহজলভ্যতা ও দ্রুত বিস্তারের কারণে সমাজের নানা শ্রেণি-পেশার মানুষ এই নেশার জালে জড়িয়ে পড়ছে।

স্থানীয়দের ভাষ্য অনুযায়ী,চিরিরবন্দর উপজেলার বিভিন্ন গ্রাম ও বাজারকেন্দ্র ঘিরে ধীরে ধীরে গড়ে উঠেছে একটি বিস্তৃত মাদক নেটওয়ার্ক। জয়পুর বাজার থেকে শুরু করে ৯নং ভিয়াইল ইউনিয়ন খেড়কাটি বাজার আমতলী বাজার তুলসীপুর গমিরাহাট বাজার এলাকায় মাদক কেনাবেচার অভিযোগ রয়েছে

অভিযোগ আছে, মোটরসাইকেল ও ইজিবাইক ব্যবহার করে ভ্রাম্যমাণ বিক্রেতারা গ্রাহকের কাছে সরাসরি মাদক পৌঁছে দিচ্ছে। ফলে নির্দিষ্ট বিক্রয়কেন্দ্র চিহ্নিত করা কঠিন হয়ে পড়ছে। অনেক সময় স্থানীয় পর্যায়ে তথ্য ফাঁস হয়ে যাওয়ায় অভিযানের আগেই কারবারিরা সতর্ক হয়ে যায়। আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর উপস্থিতি টের পেয়েই তারা দ্রুত মাদক সরিয়ে ফেলার সুযোগ পাচ্ছে।

মাদকের ভয়াবহ প্রভাব এখন আর কোনো একটি শ্রেণির মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই। দিনমজুর, ব্যবসায়ী, বেকার যুবক থেকে শুরু করে শিক্ষার্থীরাও এই সংকটে জড়িয়ে পড়ছে। বিশেষ করে তরুণদের মধ্যে ইয়াবা ও গাঁজার ব্যবহার উদ্বেগজনক হারে বেড়েছে। শিক্ষক ও অভিভাবকদের মতে, স্কুল-কলেজপড়ুয়া শিক্ষার্থী ও উঠতি বয়সী তরুণদের একটি অংশ খুব সহজেই মাদকের সংস্পর্শে চলে যাচ্ছে। কৌতূহল, বন্ধুদের প্রভাব ও বেকারত্ব তাদের এই অন্ধকার পথে ঠেলে দিচ্ছে।

অনুসন্ধানে জানা গেছে, তুলনামূলক বেশি দামের কারণে ফেনসিডিলের ব্যবহার দেখা যাচ্ছে কিছুটা সচ্ছল শ্রেণির মধ্যে। অন্যদিকে ইয়াবা, গাঁজা ও চোলাই মদের কম দাম ও সহজলভ্যতার কারণে নিম্ন ও মধ্যবিত্ত শ্রেণির মানুষের মধ্যেই এসব নেশার বিস্তার বেশি।

গত এক বছরে চিরিরবন্দর থানা পুলিশ, মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তর ও ভ্রাম্যমাণ আদালতের একাধিক অভিযানে বেশ কয়েকজন মাদক ব্যবসায়ী ও সেবনকারী গ্রেপ্তার হয়েছে। উদ্ধার করা হয়েছে ইয়াবা, গাঁজা ও অন্যান্য মাদকদ্রব্য। বিভিন্ন সময়ে কারাদণ্ড ও অর্থদণ্ডও দেওয়া হয়েছে। তবে স্থানীয়দের প্রশ্ন থেকেই যাচ্ছে—কেন বারবার ধরা পড়ছে খুচরা বিক্রেতারাই? মাদকের মূল হোতারা কিংবা বড় চালান নিয়ন্ত্রণকারী সিন্ডিকেট কীভাবে আইনের বাইরে থেকে যাচ্ছে?

স্থানীয় সবুজ ইসলাম বলেন, “ছোটখাটো বিক্রেতাদের গ্রেপ্তার করা হলেও বড় মাদক ব্যবসায়ীদের বিরুদ্ধে দৃশ্যমান ব্যবস্থা খুব কম দেখা যায়। ফলে কিছুদিন পরিস্থিতি শান্ত থাকলেও পরে আবার একইভাবে মাদক কারবার শুরু হয়।”

শিক্ষক মো. মাসুদ রহমান বলেন, “মাদক শুধু একজন মানুষকে নয়; একটি পরিবার ও পুরো সমাজকে ধ্বংস করে। শিক্ষার্থীদের মধ্যে সচেতনতা বাড়ানো এবং সরবরাহকারীদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা না নিলে ভবিষ্যৎ প্রজন্ম ভয়াবহ সংকটে পড়বে।”

সমাজকর্মীদের মতে, মাদকের বিস্তার এখন আর কেবল আইনশৃঙ্খলার বিষয় নয়; এটি একটি গভীর সামাজিক সংকট। পরিবার, শিক্ষা প্রতিষ্ঠান, ধর্মীয় সংগঠন, জনপ্রতিনিধি ও সামাজিক সংগঠনগুলোকে একযোগে কাজ করতে হবে। পাশাপাশি তরুণদের খেলাধুলা, সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ড ও কর্মসংস্থানের সঙ্গে যুক্ত করার ওপর গুরুত্বারোপ করেন তারা।

এ বিষয়ে চিরিরবন্দর থানার অফিসার ইনচার্জ (ওসি) মাহামুদুল-নবী বলেন, “মাদকের বিরুদ্ধে নিয়মিত ও ধারাবাহিক অভিযান পরিচালনা করা হচ্ছে। গোয়েন্দা নজরদারি বাড়ানো হয়েছে। তথ্যভিত্তিক অভিযানের মাধ্যমে মাদক সংশ্লিষ্ট সবাইকে আইনের আওতায় আনা হবে। কোনো মাদক কারবারিকেই ছাড় দেওয়া হবে না।”

একসময় শান্ত ও সৌহার্দ্যের জনপদ হিসেবে পরিচিত চিরিরবন্দর আজ মাদকের বিষাক্ত ছোবলে উদ্বিগ্ন। প্রশ্ন একটাই—সমাজের সব স্তরের মানুষ একসঙ্গে না জাগলে কি এই অন্ধকার থেকে মুক্তি মিলবে? এখনই কার্যকর উদ্যোগ না নিলে আগামী প্রজন্মের জন্য আরও কঠিন বাস্তবতা অপেক্ষা করছে বলেই মনে করছেন সচেতন মহল।