পিরোজপুরে ২০২৬ সালের উচ্চমাধ্যমিক সার্টিফিকেট (এইচএসসি) পরীক্ষায় দুটি প্রতিষ্ঠানের কলেজ শাখা থেকে অংশ নেওয়া সাতজন শিক্ষার্থীর কেউই পাস করতে পারেননি। শতভাগ অকৃতকার্য হওয়া প্রতিষ্ঠান দুটি হলো—নাজিরপুরের দিঘিরজান সেকেন্ডারি স্কুল অ্যান্ড কলেজ এবং পিরোজপুর সদরের কদমতলা জর্জ হাই স্কুল অ্যান্ড কলেজ।
পরীক্ষার ফলাফল বিশ্লেষণ করে দেখা যায়, দিঘিরজান সেকেন্ডারি স্কুল অ্যান্ড কলেজ থেকে এ বছর মানবিক বিভাগের পাঁচজন পরীক্ষার্থী অংশ নিলেও তাঁদের একজনও উত্তীর্ণ হতে পারেননি। অন্যদিকে কদমতলা জর্জ হাই স্কুল অ্যান্ড কলেজে তিনজন পরীক্ষার্থী ফরম পূরণ করলেও পরীক্ষায় অংশ নেন দুজন—যাঁদের দুজনেই অকৃতকার্য হয়েছেন।
প্রতিষ্ঠান দুটির চিত্র ও বিগত বছরের পারফরম্যান্স
- দিঘিরজান সেকেন্ডারি স্কুল অ্যান্ড কলেজ (নাজিরপুর):
২০১৪ সালে পাঠদানের অনুমতি পাওয়া এই প্রতিষ্ঠানে বর্তমানে ৮ জন শিক্ষক ও ২ জন কর্মচারী রয়েছেন। গত চার বছরের ফলাফল পর্যালোচনায় দেখা যায়, ২০২৩ সালে ৩৯ জন পরীক্ষার্থীর মধ্যে পাস করেন ১৮ জন, ২০২৪ সালে ২৭ জনের মধ্যে ১৩ জন এবং ২০২৫ সালে ১৫ জনের মধ্যে মাত্র ৫ জন উত্তীর্ণ হন। চলতি ২০২৬ সালে ৫ জন অংশ নিয়ে শূন্য পাসের মুখে পড়ে প্রতিষ্ঠানটি।
- কদমতলা জর্জ হাই স্কুল অ্যান্ড কলেজ (পিরোজপুর সদর):
২০২৩ সালে অনুমতি পাওয়া এই কলেজ শাখায় কোনো পৃথক শিক্ষক নেই; মাধ্যমিক শাখার ১৬ জন শিক্ষকই কলেজ শাখার পাঠদান পরিচালনা করেন। চলতি বছর অকৃতকার্য হওয়া শিক্ষার্থী দুজন গত বছরও পরীক্ষা দিয়ে ফেল করেছিলেন। ২০২৩ সালে এ প্রতিষ্ঠান থেকে ১২ জনের মধ্যে ৬ জন, ২০২৪ সালে ৭ জনের মধ্যে ৩ জন এবং ২০২৫ সালে ৭ জনের মধ্যে ৪ জন পাস করেছিলেন।
কেন এই বিপর্যয়?
নন-এমপিও ও তীব্র আর্থিক সংকট
প্রতিষ্ঠান দুটি নন-এমপিওভুক্ত হওয়ায় শিক্ষকেরা সরকারি কোনো বেতন-ভাতা পান না। দিঘিরজান কলেজের ব্যবসায় শিক্ষা বিভাগের শিক্ষক সুমন বিশ্বাস জানান, শিক্ষকেরা চরম আর্থিক অসচ্ছলতার মধ্যে দিন কাটাচ্ছেন। সরকারি সুযোগ-সুবিধা না থাকায় নতুন শিক্ষার্থীরাও এসব প্রতিষ্ঠানে ভর্তি হতে আগ্রহী হচ্ছেন না।
শিক্ষার্থীদের ক্লাসে চরম অনুপস্থিতি
শিক্ষকদের মতে, শিক্ষার্থীদের নিয়মিত ক্লাসমুখী করতে নানা উদ্যোগ নেওয়া হলেও উপস্থিতি নিশ্চিত করা সম্ভব হচ্ছে না। শিক্ষার্থীরা বাড়ি থেকে বের হলেও কলেজে আসেন না। ফলে পাঠদান ব্যাহত হচ্ছে এবং পরীক্ষায় মারাত্মক নেতিবাচক প্রভাব পড়ছে।
বিষয়ভিত্তিক শিক্ষকের অভাব
কদমতলা জর্জ হাই স্কুল অ্যান্ড কলেজের ভারপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষক মো. হাফিজুর রহমান জানান, গ্রামীণ পর্যায়ের এই প্রতিষ্ঠানে বিষয়ভিত্তিক শিক্ষক না থাকায় মাধ্যমিকের শিক্ষকদের দিয়ে চালাতে হচ্ছে। অথচ এ প্রতিষ্ঠানের স্কুল শাখার ফলাফল প্রশংসনীয়; এ বছর (২০২৬) এসএসসি পরীক্ষায় ৫০ জনের মধ্যে ৪৫ জন পাস করেছেন, যার পাসের হার ৯০ শতাংশ।
পিরোজপুর জেলাজুড়ে পাসের হারে রেকর্ড পতন
বরিশাল মাধ্যমিক ও উচ্চমাধ্যমিক শিক্ষা বোর্ডের অধীনে ছয়টি জেলার মধ্যে এবার পাসের হারে শীর্ষে রয়েছে পিরোজপুর। তবে জেলার সার্বিক ফলাফলে বিগত তিন বছরের মধ্যে দেখা গেছে মারাত্মক অবনতি:
|
বছর |
পাসের হার (%) |
|
২০২৪ |
৮৩.৩৩% |
|
২০২৫ |
৬৪.০৭% |
| ২০২৬ |
৫১.৫৫% |
চলতি বছরের জেলা ফলে (২০২৬) মোট ৭,০৯৮ জন পরীক্ষার্থীর মধ্যে অংশ নেন ৬,৭৮২ জন। উত্তীর্ণ হয়েছেন ৩,৪৯৬ জন, যার সামগ্রিক পাসের হার ৫১.৫৫%। জিপিএ-৫ পেয়েছেন ৬৬ জন। বিগত বছরগুলোর তুলনায় এই ফলাফল ২০০৯ সালের পর জেলাটিতে সর্বনিম্ন পাসের হার।
কর্তৃপক্ষের বক্তব্য
বরিশাল অঞ্চলের মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষা অধিদপ্তরের পরিচালক অধ্যাপক মো. জাকির হোসেন জানান, যেসব প্রতিষ্ঠানের কোনো শিক্ষার্থী পাস করতে পারেনি, সেগুলোর প্রধান শিক্ষকদের নিয়ে জেলাভিত্তিক সভা করা হবে। জিরো পাস করা অধিকাংশ প্রতিষ্ঠান নন-এমপিওভুক্ত হলেও অতীতের সার্বিক কার্যক্রম পর্যালোচনা করে সমস্যা চিহ্নিত ও একটি সমাধানে পৌঁছানোর চেষ্টা করা হবে।