মাদারীপুরের শিবচর উপজেলার নিলখী ইউনিয়নে জামায়াতে ইসলামীর ইউনিয়ন সভাপতি পরিচয়দানকারী তাইজুল ইসলাম ওরফে ‘ডাক্তার হুজুর’-এর একটি আপত্তিকর ভিডিও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ার পর এলাকায় ব্যাপক তোলপাড় ও চাঞ্চল্যের সৃষ্টি হয়েছে। ঝাড়ফুঁক ও পানি পড়ার আড়ালে দীর্ঘদিনের অনৈতিক কর্মকাণ্ডের অভিযোগে স্থানীয়রা তার সুষ্ঠু বিচার ও আইনি ব্যবস্থা দাবি করেছেন। এদিকে চাঞ্চল্যকর এই ঘটনার পর অভিযুক্ত নেতাকে সাংগঠনিক সব কার্যক্রম থেকে অব্যাহতি দিয়েছে উপজেলা জামায়াতে ইসলামী।
স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, গত রোববার (২৫ অক্টোবর) দুপুরে উপজেলার নিলখী পশ্চিম চরকামার কান্দিগ্রাম এলাকার অভিযুক্ত তাইজুল ইসলামের নিজ বসতঘরের একটি পরিত্যক্ত ঘরে এই ঘটনা ঘটে। ভিডিওটিতে তাকে এক নারীর সঙ্গে আপত্তিকর অবস্থায় স্থানীয়দের হাতে আটক হওয়ার দৃশ্য রয়েছে বলে দাবি করা হচ্ছে। গত রোববার সন্ধ্যার পর থেকেই ফেসবুকের বিভিন্ন আইডি ও গ্রুপে ভিডিওটি দ্রুত ছড়িয়ে পড়ে।
অভিযুক্ত তাইজুল ইসলাম দীর্ঘ প্রায় ২০ বছর ধরে এলাকায় নারীদের বিভিন্ন সমস্যার সমাধানের কথা বলে পানি পড়া ও ঝাড়ফুঁক দিয়ে কথিত চিকিৎসা দিয়ে আসছেন বলে অভিযোগ রয়েছে। স্থানীয়দের ভাষ্য, তিনি নিজেকে নিলখী ইউনিয়ন জামায়াতে ইসলামীর সভাপতি হিসেবে পরিচয় দিয়ে এলাকায় প্রভাব বিস্তার করতেন এবং বিভিন্ন সময় মানুষকে ভয়ভীতি দেখাতেন।
ঘটনার প্রত্যক্ষদর্শী স্থানীয় মাদ্রাসার ইমাম ও শিক্ষক মো. আবুল কালাম আজাদ জানান, গত রোববার দুপুরে আজান দেওয়ার সময় তিনি ওই ঘরে এক নারীকে প্রবেশ করতে দেখেন। পরে তিনি ভিডিও ধারণ করলে অভিযুক্ত তাইজুল ইসলাম তার ওপর চড়াও হন এবং ধারালো অস্ত্র দিয়ে প্রাণনাশের হুমকি দিয়ে ভিডিও মুছে ফেলতে বাধ্য করার চেষ্টা করেন। এ ঘটনায় নিজের জীবনের নিরাপত্তা চেয়ে তিনি শিবচর থানায় একটি সাধারণ ডায়েরি (জিডি নং: ১২৫৭, তারিখ: ২৬/১০/২০২৬, ট্র্যাকিং নং: W5AOQH) দায়ের করেছেন।
এলাকার সাবেক যুবদল সভাপতি মো. মিন্টু মাতুব্বরসহ স্থানীয় মুরুব্বিরা অভিযোগ করেন, অতীতে মসজিদ-মাদ্রাসা নিয়ে অনিয়মের অভিযোগ ওঠার পর থেকেই তাকে মূল দায়িত্ব থেকে সরিয়ে দেওয়া হয়েছিল। কিন্তু তিনি সরল প্রকৃতির নারীদের তাবিজ-কবজ ও ঝাড়ফুঁকের নামে প্রতারণা ও অনৈতিক কার্যক্রমে লিপ্ত ছিলেন। সম্প্রতি ভিডিওটি ভাইরালের পর এলাকাবাসীর মাঝে চরম ক্ষোভ বিরাজ করছে।
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ভিডিওটি ছড়িয়ে পড়ার পর অভিযুক্ত তাইজুল ইসলাম তার ব্যক্তিগত ফেসবুক আইডি থেকে দাবি করেন, ভিডিওতে যাকে দেখা গেছে তিনি তার নিজের স্ত্রী। তবে ঘটনার পর থেকেই তিনি এলাকা ছেড়ে আত্মগোপনে থাকায় তার সরাসরি বক্তব্য নেওয়া সম্ভব হয়নি।
এ বিষয়ে শিবচর উপজেলা জামায়াতে ইসলামীর আমির সরোয়ার হোসাইন মৃধার সঙ্গে মুঠোফোনে যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তিনি ফোন রিসিভ করেননি।
ঘটনার সত্যতা যাচাই ও শৃঙ্খলা বজায় রাখতে আজ বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী শিবচর উপজেলা শাখার পক্ষ থেকে একটি প্রেস বিজ্ঞপ্তি দেওয়া হয়েছে।
উপজেলা জামায়াতের সেক্রেটারি ইউসুফ হাওলাদার স্বাক্ষরিত ওই প্রেস বিজ্ঞপ্তিতে জানানো হয়—
“সম্প্রতি বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী, নিলখী ইউনিয়ন শাখার তাইজুল ইসলামের নৈতিকতা বিবর্জিত কর্মকাণ্ড সংক্রান্ত অভিযোগ সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রকাশিত হয়েছে, যা শিবচর উপজেলা শাখার দৃষ্টিগোচর হয়েছে। সংগঠন নৈতিকতা, সততা, শৃঙ্খলা ও জবাবদিহিতাকে অত্যন্ত গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করে। এরই প্রেক্ষিতে, সাংগঠনিক শৃঙ্খলা বজায় রাখা এবং বিষয়টি পর্যালোচনার স্বার্থে নিলখী ইউনিয়ন শাখার তাইজুল ইসলামকে শিবচর উপজেলা শাখার অধীন সকল প্রকার সাংগঠনিক কার্যক্রম থেকে অব্যাহতি প্রদান করা হলো। অভিযোগ প্রমাণিত হলে সাংগঠনিক নিয়ম অনুযায়ী পরবর্তী পদক্ষেপ নেওয়া হবে।”
এদিকে, অবিলম্বে এই ঘটনার নিরপেক্ষ তদন্তপূর্বক অভিযুক্তের বিরুদ্ধে কঠোর আইনি ব্যবস্থা নেওয়ার জন্য প্রশাসনের প্রতি জোর দাবি জানিয়েছেন স্থানীয় এলাকাবাসী।