মাদারীপুরের শিবচরে সরকারি প্রণোদনা ও খাদ্য সহায়তার চাল পাওয়ার কথা প্রকৃত জেলেদের। অথচ পদ্মাপাড়ের খাঁটি মৎস্যজীবীরা যখন বছরের পর বছর খালিহাতে ফিরছেন, তখন বহালতবিয়তে চাল খাচ্ছেন ব্যবসায়ী, কৃষক, ভ্যানচালক ও সচ্ছল ব্যক্তিরা। জনপ্রতিনিধিদের তৈরি করা ত্রুটিপূর্ণ ও অনিয়মে ভরা তালিকার কারণে এই উপজেলার হাজারো ভুয়া জেলে সরকারি সুবিধা ভোগ করছেন বলে অভিযোগ উঠেছে।

উপজেলা মৎস্য অফিস সূত্রে জানা যায়, শিবচরে নিবন্ধিত জেলের সংখ্যা ৬ হাজার ৫৪২ জন। এর মধ্যে পৌরসভাসহ বিভিন্ন ইউনিয়নের মধ্যে চরজানাজাতে ৯৫১ জন, বন্দরখোলায় ৬৭২ জন, বাঁশকান্দিতে ৫৬৪ জন, নিলক্ষীতে ৪৮৮ জন এবং দত্তপাড়ায় ৪৩২ জনসহ প্রতিটি এলাকায় তালিকাভুক্ত জেলে রয়েছে। প্রতি বছর জুলাই থেকে ডিসেম্বরের মধ্যে স্থানীয় কমিটির মাধ্যমে এই তালিকা হালনাগাদ করা হয়। তবে মৎস্য বিভাগের দাবি, মূলত স্থানীয় জনপ্রতিনিধিরাই এই তালিকা তৈরি করে থাকেন।

মাঠপর্যায়ে খোঁজ নিয়ে জানা যায় ভিন্ন চিত্র। চরজানাজাত ও কাঁঠালবাড়ি ইউনিয়নের পদ্মা পাড়ের প্রকৃত জেলেদের অভিযোগ, দুই থেকে তিন পুরুষ ধরে নদীতে মাছ শিকার করেই যাদের জীবিকা, তাদের অনেকেই সরকারি তালিকায় স্থান পাননি। অথচ চরজানাজাত ইউনিয়নের আয়নাল খা, ইলিয়াস বেপারী, বাচ্চু মোড়ল, মালেক ফকিরসহ বিভিন্ন এলাকার অনেকেই জীবনে কখনো নদী বা জালের মুখ দেখেননি। তারা মূলত কৃষি কাজ বা ব্যবসা করেন, কিন্তু নিয়মিত পাচ্ছেন জেলের চাল।

পদ্মা নদীতে মাছ শিকাররত অবস্থায় কথা হয় চরজানাজাত ইউনিয়নের ৬ নম্বর ওয়ার্ডের খোকন হাওলাদার ও ৩ নম্বর ওয়ার্ডের বজলু খার সঙ্গে। ক্ষোভ প্রকাশ করে তারা জানান, বাপ-দাদার আমল থেকেই তারা নদীতে জাল টানছেন। অথচ তাদের বা পরিবারের কারো ভাগ্যে জেলের কার্ড জোটেনি। স্থানীয়দের অভিযোগ, জনপ্রতিনিধিদের অনুগত না হলে বা তদবির করতে না পারলে তালিকায় নাম ওঠানো যায় না। ফলে প্রকৃত জেলেরা বঞ্চিত হন এবং এই সুযোগে ভুয়া ও সচ্ছল ব্যক্তিরা তালিকাভুক্ত হয়ে যান।

সুশাসনের জন্য নাগরিক (সুজন)-এর শিবচর উপজেলার সভাপতি আবুল খায়ের খান বলেন, “অতীতে জনপ্রতিনিধিরা তাদের নিকটাত্মীয় ও পছন্দের লোকজনকে দিয়ে তালিকা তৈরি করেছেন। যার ফলে প্রকৃত জেলেরা বাদ পড়েছেন এবং সচ্ছল ব্যক্তিরা জেলে হিসেবে তালিকাভুক্ত হয়েছেন।”

এ বিষয়ে শিবচর উপজেলা সিনিয়র মৎস্য কর্মকর্তা সত্যজিৎ মজুমদার জানান, অপ্রকৃত জেলের নাম তালিকায় থেকে থাকলে সুনির্দিষ্ট প্রমাণ সাপেক্ষে তদন্ত সাপেক্ষে তা বাদ দেওয়া হবে। পাশাপাশি সরাসরি মৎস্য পেশার সঙ্গে যুক্ত প্রকৃত জেলেদের নতুন করে তালিকাভুক্ত করার কাজ চলছে।

(ইউএনও) এইচ. এম. ইবনে মিজান বলেন, “জাল যার, তিনিই প্রকৃত জেলে। এর বাইরে অন্য কোনো পেশার ব্যক্তির জেলে তালিকায় অন্তর্ভুক্ত হওয়ার কোনো সুযোগ নেই। মৎস্য বিভাগের সঙ্গে সমন্বয় করে তালিকা দ্রুত পুনঃযাচাই করা হবে এবং প্রকৃত জেলেদের অন্তর্ভুক্ত করে ভুয়াদের বাদ দেওয়ার উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে।