ঈদ মানে আনন্দ, ঈদ মানে খুশি। ঈদ হলো পরিবারের সবাইকে নিয়ে একসঙ্গে বসে খাওয়া-দাওয়া, গল্প, হাসি আর আনন্দে মেতে ওঠা। বছরের দুই ঈদের পাশাপাশি এবার আরেকটি আনন্দমুখর ঈদ উদযাপন করলাম বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের সাংবাদিক সমিতিতে।হাসি, আড্ডা, খেলাধুলা আর নানা আয়োজনে জমে উঠেছিল সেই ব্যতিক্রমী ঈদ উদযাপন।
ঈদের আগের রাত থেকে শুরু হয়েছিল আমাদের ‘বাউজা ঈদ’ এর প্রস্তুতি। ছোটদের ঈদের আগের রাতে যেমন উপহার দেওয়া হয়, তেমনি আমাদেরও ছোট্ট চমক দিলেন সমিতির সভাপতি তানভীর ভাই। ছেলেরা পেল আতর, আর মেয়েদের হাতে উঠল মেহেদি। উপহার হাতে পেয়ে যেন বুঝতে পারছিলাম,পরের দিনটি কতটা বিশেষ হতে যাচ্ছে।
আপুদের সঙ্গে গল্প করতে করতে হলে ফিরলাম। কে কী পোশাক পরবে, কীভাবে সাজবে, হাতে কেমন মেহেদি দেবে, পরদিন কী কী আয়োজন হবে,এসব নিয়ে চলল গল্প। সবার মধ্যে তখন অন্যরকম এক উত্তেজনা। বিশেষ করে আমাদের মতো জুনিয়রদের জন্য এই আয়োজন ছিল আরও বেশি আনন্দের। কারণ, বিশ্ববিদ্যালয় জীবনে এমন ঈদ আমরা আগে কখনো পাইনি।
রাতে দুই হাত ভরে মেহেদি পরে নিলাম। হাতে মেহেদির রং বসার অপেক্ষার সঙ্গে সঙ্গে যেন মনের ভেতরেও জমতে থাকল পরদিনের আনন্দের রং।মেহেদি হাতে দেওয়ার পাশাপাশি শুরু হলো ঈদের আগের রাতের আরেক আনন্দ।সিনিয়র ভাইয়া-আপুদের ফোন করে ঈদের সালামি চাওয়া। কেউ মজা করলেন, কেউ আবার হাসতে হাসতে সালামির প্রতিশ্রুতি দিলেন। সব মিলিয়ে রাতটা যেন ঈদের আগমনী বার্তায় ভরে উঠেছিল।
ঈদের সকালটাও ছিল অন্যরকম। বাড়িতে মা যেমন ঈদের সকালে সেমাই রান্না করেন, তেমনি আমাদের জন্য সেমাই রান্না করলেন তাসমিন আপু।
সুন্দর করে সেজেগুজে আমরা চলে গেলাম সাংবাদিক সমিতিতে। শুধু আমরা নই, আমাদের প্রিয় সমিতিটাও সেজেছিল নতুন সাজে। বেলুন আর নতুন পর্দায় সাজানো হয়েছিল আমাদের সাংবাদিক সমিতি। মনে হচ্ছিল, ছোট্ট এই ঘরটি আজ আমাদের ঈদের বাড়ি।
এরপর শুরু হলো জমজমাট আড্ডা। আপুর হাতে বানানো সেমাইয়ের সঙ্গে ছিল মিষ্টি আর নুডলস। খাবারের ঘ্রাণ, চারপাশের হাসি আর গল্প,সব মিলিয়ে মুহূর্তগুলো হয়ে উঠেছিল ভীষণ আনন্দের।
এরপর শুরু হলো সবচেয়ে মজার খেলা।
একটি বাক্সে রাখা ছিল অনেকগুলো কাগজ। প্রতিটি কাগজে লেখা ছিল ভিন্ন ভিন্ন কাজ। যার ভাগ্যে যে কাগজ উঠবে, তাকে সেটি করতে হবে। কাগজ হাতে নেওয়ার আগে যেমন ভয় লাগছিল,‘না জানি কী আসে!’তেমনি অন্যদের পালা দেখে হাসিও থামছিল না।কারও কাগজে ছিল নিজের জীবন নিয়ে সত্যি কথা বলা। কেউ আবার পেল নিজের সম্পর্কে মিথ্যা কথা বলার দায়িত্ব। কারও ভাগ্যে জুটল সবার প্রশ্নের উত্তর দেওয়া, কেউ গান গাইলেন, কেউ শোনালেন কৌতুক। কারও কাছে এলো,‘বিয়ে কবে করবেন?’ আবার কেউ পেলেন ভবিষ্যতে বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য হলে কী করবেন, সেই প্রশ্নের উত্তর দেওয়ার দায়িত্ব।
প্রতিটি কাজেই ছিল হাসির খোরাক। কেউ লজ্জায় হাসছিলেন, কেউ নিজেকে সামলাতে পারছিলেন না, আবার কেউ অন্যের পালা দেখেই হেসে কুটিকুটি। সবচেয়ে সুন্দর ব্যাপার ছিল,সেদিন সেখানে যেন কোনো সিনিয়র-জুনিয়র বিভাজন ছিল না। সবাই সবাইকে নিয়ে মেতে উঠেছিলাম।সত্যিই, সেটি ছিল ছোট-বড় সবার এক অপূর্ব মেলবন্ধন।
এরপর শুরু হলো আরো খেলার আয়োজন। দূর থেকে ঝুড়িতে বল ফেলতে হবে।খেলাটা শুনতে যত সহজ, করতে গিয়ে ততটাই কঠিন।তবে কঠিনের চেয়েও মজার ছিল এর প্রতিটি মুহূর্ত। আমিও শেষ পর্যন্ত ঝুড়িতে বল ফেলতে পেরেছিলাম।সেই ছোট্ট সফলতাটাও তখন বড় আনন্দের মনে হচ্ছিল।
এরপর এলো আরও মজার খেলা ‘হাড়ি ভাঙা’। চোখ বেঁধে দেওয়া হচ্ছে, সামনে কোথায় হাড়ি তা কেউ জানে না। তারপর শুরু হলো এদিক-ওদিক ঘোরাঘুরি। কে কোন দিকে যাচ্ছে, তার কোনো ঠিক নেই। চারপাশ থেকে সবার হাসি, চিৎকার আর দিকনির্দেশনা।সব মিলিয়ে মুহূর্তটি হয়ে উঠেছিল অসাধারণ আনন্দের।
খেলা, হাসি আর আড্ডায় কখন যে সন্ধ্যা নেমে এলো, টেরই পাইনি। এরপর সবাই রওনা দিলাম রাতের খাবারের উদ্দেশ্যে। গন্তব্য ‘কাচ্চি মশাই’। সেখানে পৌঁছে একটি বড় টেবিলজুড়ে সবাই পাশাপাশি বসে পড়লাম।খাবারের টেবিলেও থামেনি গল্প। কে কতটুকু খেতে পারছে, কে খাবার শেষ করতে পারছে না, কে বেশি খেল,এসব নিয়ে চলতে লাগল নতুন করে হাসি-ঠাট্টা। মনে হচ্ছিল, খাওয়ার চেয়েও বেশি উপভোগ করছি একসঙ্গে থাকার মুহূর্তটাকে।
খাওয়া শেষে সবাই মিলে ছবি তুললাম। ছবির ফ্রেমে বন্দী হলো হাসিমাখা কিছু মুখ, কিন্তু সেই ছবির বাইরেও থেকে গেল অসংখ্য অদৃশ্য স্মৃতি। তারপর আবার হলের পথে যাত্রা। ফিরতে ফিরতে মনে হচ্ছিল,এই ঈদটা সত্যিই অন্যরকম ছিল।
বাড়ি থেকে দূরে বিশ্ববিদ্যালয়ের জীবনে আমরা অনেকে পরিবারকে খুব মিস করি। ঈদের দিনে বাড়ির মানুষ, মায়ের রান্না, পরিবারের সঙ্গে বসে গল্প করা,সবকিছুর জন্য মন কেমন করে। কিন্তু কখনো কখনো জীবন আমাদের আরেকটি পরিবারও উপহার দেয়। রক্তের সম্পর্ক না থাকলেও যাদের সঙ্গে হাসি ভাগ করে নেওয়া যায়, মন খারাপের কথা বলা যায়, বিপদে পাশে পাওয়া যায়,তারাও তো পরিবারেরই মানুষ।আমাদের জন্য বাকৃবির সাংবাদিক সমিতি তেমনই এক পরিবার।
এই পরিবারে আছে কাজ, দায়িত্ব, ব্যস্ততা। আবার আছে হাসি, আড্ডা, দুষ্টুমি, স্নেহ, সহযোগিতা আর একে অন্যের প্রতি আন্তরিকতা। বাড়ি থেকে দূরে এসে বিশ্ববিদ্যালয়ের এই জীবনেই আমরা যেন নতুন এক পরিবার খুঁজে পেয়েছি।
আর সেই পরিবারের সঙ্গেই এবার আমাদের ঈদ উদযাপন। এই ঈদে রয়েছে কিছু মানুষ, কিছু হাসি, কিছু খেলা, একসঙ্গে খাওয়া আর একে অন্যের সঙ্গে কাটানো কয়েকটি সুন্দর ঘণ্টা।জীবনের সবচেয়ে সুন্দর স্মৃতিগুলো অনেক সময় এমন ছোট ছোট মুহূর্ত থেকে তৈরি হয়।
‘বাউজা ঈদ’ তাই শুধু একটি দিনের আয়োজন নয়, এটি আমাদের একসঙ্গে থাকার গল্প, আপন হয়ে ওঠার গল্প, দূরে থেকেও পরিবার খুঁজে পাওয়ার গল্প।
দিনটি শেষ হয়ে গেছে, আয়োজনও শেষ হয়েছে। মেহেদির রং হয়তো একদিন মুছে যাবে, খেলার হাসিগুলোও থেমে যাবে। কিন্তু থেকে যাবে শুধু স্মৃতিগুলো।আর সেই স্মৃতির পাতায় ‘বাউজা ঈদ’ হয়ে থাকবে আমাদের বিশ্ববিদ্যালয় জীবনের এক টুকরো সুন্দর, উষ্ণ ও ভালোবাসায় ভরা ঈদ।যেখানে আমরা সবাই ছিলাম, আর ছিল আমাদের একসঙ্গে হয়ে ওঠা একটি পরিবার।