ঘরের ভেতরেই নিরাপত্তাহীন কিশোরী! ঈশ্বরগঞ্জে ধর্ষণের অভিযোগে বাবা গ্রেপ্তার।
তিন দিন নীরব থাকার পর সৎমাকে জানায় কিশোরী, অভিযোগের পরও সামনে আসে ভয়ভীতি ও হুমকির তথ্য। একজন কিশোরীর জন্য নিজের ঘরই হওয়ার কথা সবচেয়ে নিরাপদ আশ্রয়। অথচ সেই ঘরের ভেতরেই যদি নির্যাতনের অভিযোগ ওঠে পরিবারের একজন সদস্যের বিরুদ্ধে, তাহলে প্রশ্ন ওঠে—নিরাপত্তার শেষ আশ্রয়টুকুও কি হারিয়ে যাচ্ছে?
ময়মনসিংহের ঈশ্বরগঞ্জে ১৭ বছর বয়সী এক কিশোরীকে ধর্ষণের অভিযোগে তার বাবা নুরুল হক (৪৫)-কে গ্রেপ্তারের ঘটনায় এমনই এক ভয়াবহ প্রশ্ন সামনে এসেছে। উপজেলার উত্তর কাকনহাটি গ্রামের এ ঘটনায় অভিযোগের পাশাপাশি উঠে এসেছে ভয়ভীতি, হুমকি এবং ঘটনা প্রকাশে বিলম্বের তথ্য।
পুলিশ ও এজাহার সূত্রে জানা যায়, গত ১৯ আগস্ট বুধবার দিবাগত রাত আনুমানিক ৩টার দিকে উত্তর কাকনহাটি গ্রামের বসতঘরের বারান্দার একটি কক্ষে ঘুমিয়ে ছিল ১৭ বছর বয়সী ওই কিশোরী। এজাহারের অভিযোগ অনুযায়ী, ওই সময় নুরুল হক মেয়েটির ওপর ঝাঁপিয়ে পড়ে এবং তার ইচ্ছার বিরুদ্ধে জোরপূর্বক ধর্ষণ করে। ঘটনার পর কিশোরী ও তার মাকে ভয়ভীতি ও হুমকি দেওয়া হয়েছে বলেও এজাহারে উল্লেখ করা হয়েছে। ফলে তাৎক্ষণিকভাবে বিষয়টি প্রকাশ্যে আসেনি।এই ঘটনার সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ দিকগুলোর একটি হলো—অভিযোগ অনুযায়ী ঘটনার পরপরই কিশোরী বিষয়টি কাউকে জানাতে পারেনি। প্রায় তিন দিন পর সে তার সৎমা (৩০)-কে ঘটনাটি বিস্তারিত জানায়।
এখানেই সামনে আসে যৌন নির্যাতনের ঘটনায় ভুক্তভোগীদের নীরব থাকার একটি কঠিন বাস্তবতা। ভয়, হুমকি, পারিবারিক চাপ, সামাজিক লজ্জা কিংবা ভবিষ্যৎ নিয়ে অনিশ্চয়তা—এসব কারণে অনেক ভুক্তভোগী তাৎক্ষণিকভাবে মুখ খুলতে পারেন না। বিশেষ করে অভিযুক্ত ব্যক্তি যদি পরিবারেরই সদস্য হন, তাহলে অভিযোগ জানানো আরও কঠিন হয়ে উঠতে পারে। তাই কোনো কিশোরী তাৎক্ষণিকভাবে অভিযোগ করেনি—এটিকে তার বক্তব্যের বিশ্বাসযোগ্যতার বিরুদ্ধে সরল যুক্তি হিসেবে দেখা উচিত নয়। বরং কী কারণে সে নীরব ছিল, সেই পরিস্থিতিও তদন্তের অংশ হওয়া প্রয়োজন।
ঘটনার কয়েক দিন পর কিশোরী তার সৎমাকে বিষয়টি জানালে পরিবারের পক্ষ থেকে আইনি পদক্ষেপ নেওয়া হয়। বৃহস্পতিবার (২৭ আগস্ট) রাত আনুমানিক ১১টার দিকে ভুক্তভোগীর মা বাদী হয়ে ঈশ্বরগঞ্জ থানায় নারী ও শিশু নির্যাতন দমন আইনে লিখিত এজাহার দায়ের করেন।
এরপর পুলিশ অভিযান চালিয়ে শুক্রবার (২৮ আগস্ট) ভোরে ঈশ্বরগঞ্জ মুক্তিযোদ্ধা মোড় সংলগ্ন হাসপাতাল রোড এলাকা থেকে নুরুল হককে গ্রেপ্তার করে। গ্রেপ্তার নুরুল হক উত্তর কাকনহাটি গ্রামের ৯ নম্বর ওয়ার্ডের মৃত হাছান আলীর ছেলে।
পুলিশের তথ্য অনুযায়ী, নুরুল হক এই মামলার পাশাপাশি ঢাকার বাড্ডা থানায় দণ্ডবিধির ৩৯৪ ধারায় দায়ের করা একটি দস্যুতা মামলারও ওয়ারেন্টভুক্ত আসামি। অর্থাৎ কিশোরীকে ধর্ষণের অভিযোগের মামলায় গ্রেপ্তারের সময় তার বিরুদ্ধে আরেকটি মামলায়ও গ্রেপ্তারি পরোয়ানা কার্যকর ছিল বলে জানিয়েছে পুলিশ।
ঈশ্বরগঞ্জ থানার অফিসার ইনচার্জ রবিউল আজম বলেন, কিশোরীর সৎমায়ের দায়ের করা অভিযোগের ভিত্তিতে নুরুল হককে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। তার বিরুদ্ধে বাড্ডা থানার দস্যুতা মামলায়ও গ্রেপ্তারি পরোয়ানা ছিল। পুলিশ তাকে নারী ও শিশু নির্যাতন এবং দস্যুতা—দুই মামলাতেই গ্রেপ্তার দেখিয়ে আদালতে পাঠিয়েছে।
ঘটনাটি শুধু একজন অভিযুক্তকে গ্রেপ্তারের মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়। এর নেপথ্যে রয়েছে আরও কিছু গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন। একজন কিশোরী নিজের পরিবারের ভেতরে কতটা নিরাপদ ছিল?- অভিযোগ সত্য হলে, এমন ভয়াবহ ঘটনা ঘটার পরও কেন তাকে ও তার মাকে ভয়ভীতি দেখানোর সুযোগ তৈরি হলো? পরিবারের অন্য সদস্যরা কি আগে কোনো অস্বাভাবিক আচরণ লক্ষ্য করেছিলেন? এবং সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ—কিশোরীকে ভবিষ্যতে নিরাপদ রাখতে পরিবার, স্থানীয় প্রশাসন ও আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর ভূমিকা কী হবে? এসব প্রশ্নের উত্তর শুধু একটি মামলার তদন্তের জন্য নয়, সমাজের সামগ্রিক নিরাপত্তার জন্যও গুরুত্বপূর্ণ।
যৌন নির্যাতনের অভিযোগকে পারিবারিক সম্মান রক্ষার নামে গোপন করে রাখা কোনো সমাধান নয়। বরং নীরবতা অনেক ক্ষেত্রে ভুক্তভোগীকে আরও অসহায় এবং অপরাধীকে আরও শক্তিশালী করে তুলতে পারে। বিশেষ করে কিশোর-কিশোরীদের ক্ষেত্রে পরিবারের সদস্যদের উচিত তাদের কথা গুরুত্ব দিয়ে শোনা, নিরাপদ পরিবেশ তৈরি করা এবং কোনো ধরনের নির্যাতনের অভিযোগ উঠলে দ্রুত আইনগত সহায়তা নেওয়া।
এই ঘটনার ক্ষেত্রে অভিযোগের পর পরিবারের পক্ষ থেকে থানায় যাওয়ার সিদ্ধান্ত অন্তত একটি বিষয় স্পষ্ট করে—নির্যাতনের অভিযোগ চাপা না দিয়ে আইনের আওতায় আনা জরুরি। তবে নুরুল হকের বিরুদ্ধে ওঠা ধর্ষণের অভিযোগ এখনো বিচারাধীন বিষয়। পুলিশ তাকে অভিযোগের ভিত্তিতে গ্রেপ্তার করেছে; অভিযোগের সত্যতা আদালতের বিচারিক প্রক্রিয়ায় নির্ধারিত হবে।
কিন্তু অভিযোগটি সত্য হোক কিংবা মিথ্যা প্রমাণিত হোক—একটি ১৭ বছর বয়সী কিশোরীর নিরাপত্তা, মর্যাদা ও মানসিক সুস্থতা নিশ্চিত করা সমাজ ও রাষ্ট্রের দায়িত্ব। আর অভিযোগ সত্য হলে, অপরাধী যে-ই হোক, পারিবারিক পরিচয় কোনোভাবেই তাকে আইনের ঊর্ধ্বে রাখতে পারে না।