দীর্ঘ প্রতীক্ষার অবসান ঘটিয়ে আগামী ১০ আগস্ট থেকে ঢাকা-গোপালগঞ্জ রুটে আনুষ্ঠানিকভাবে চালু হচ্ছে ‘অভিযাত্রী কমিউটার’ ট্রেন। রাজধানীর সঙ্গে সরাসরি রেল যোগাযোগ স্থাপনের এই উদ্যোগে উচ্ছ্বসিত গোপালগঞ্জের সাধারণ মানুষ। কম খরচে নিরাপদ ও স্বাচ্ছন্দ্যপূর্ণ যাতায়াতের পাশাপাশি নতুন এই রেলসেবা স্থানীয় ব্যবসা-বাণিজ্য ও কৃষিপণ্য পরিবহনেও ইতিবাচক প্রভাব ফেলবে বলে আশা করছেন সংশ্লিষ্টরা।
বাংলাদেশ রেলওয়ে সূত্রে জানা গেছে, ১০ আগস্ট দুপুর ২টা ৩০ মিনিটে ঢাকার উদ্দেশে গোপালগঞ্জের পথে প্রথমবারের মতো যাত্রা করবে ‘অভিযাত্রী কমিউটার’। ট্রেনটি সন্ধ্যা ৬টা ৪৫ মিনিটে গোপালগঞ্জে পৌঁছাবে। একই দিন সন্ধ্যা ৭টা ২৫ মিনিটে গোপালগঞ্জ থেকে ঢাকার উদ্দেশে ছেড়ে রাত ১০টা ২৫ মিনিটে রাজধানীতে পৌঁছানোর কথা রয়েছে।
প্রায় ৭০০ আসনবিশিষ্ট এই ট্রেনে যাত্রী পরিবহনের পাশাপাশি ভবিষ্যতে পণ্য পরিবহনের সুযোগ বাড়ানোর সম্ভাবনাও রয়েছে। বিশেষ করে কৃষিপ্রধান গোপালগঞ্জের উৎপাদিত শাকসবজি ও অন্যান্য কৃষিপণ্য দ্রুত ও কম খরচে ঢাকার বাজারে পাঠানোর ক্ষেত্রে রেল যোগাযোগ গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে বলে মনে করছেন স্থানীয়রা।
নতুন এই রেলসেবার সবচেয়ে বড় আকর্ষণ ভাড়া। সড়কপথে গোপালগঞ্জ থেকে ঢাকায় যেতে যেখানে সাধারণত ৬০০ থেকে ৮০০ টাকা পর্যন্ত খরচ হয়, সেখানে ট্রেনে মাত্র ১৪৫ টাকায় যাতায়াত করা যাবে। ফলে নিম্ন ও মধ্যবিত্ত শ্রেণির মানুষের জন্য এটি স্বস্তির খবর হয়ে এসেছে। পাশাপাশি সড়কপথের যানজট ও দুর্ঘটনার ঝুঁকি এড়িয়ে তুলনামূলক নিরাপদ ও আরামদায়ক যাতায়াতের সুযোগ তৈরি হবে।
গোপালগঞ্জের রেলযান পরীক্ষক পল্লব কান্তি বিশ্বাস বলেন, ঢাকা-গোপালগঞ্জ রুটে সরাসরি এক জোড়া ট্রেন চালু করা স্থানীয় মানুষের দীর্ঘদিনের প্রত্যাশা ছিল। প্রায় ৭০০ আসনের এই কমিউটার ট্রেনে ১৪৫ টাকায় ঢাকায় যাতায়াত করা যাবে। ভবিষ্যতে অতিরিক্ত লাগেজ বগি যুক্ত করা হলে কৃষকরা তাদের উৎপাদিত পণ্য কম খরচে রাজধানীর বাজারে পাঠানোর সুযোগ পাবেন।
স্থানীয় বাসিন্দা মো. মনির বলেন, নিম্ন ও মধ্যবিত্ত মানুষের জন্য নতুন এই ট্রেন বড় ধরনের সুবিধা নিয়ে আসবে। বাসের তুলনায় অনেক কম খরচে ঢাকায় যাওয়া সম্ভব হবে। কৃষিপণ্য পরিবহনের ব্যবস্থা করা গেলে গোপালগঞ্জের কৃষকরাও সরাসরি উপকৃত হবেন।
আরেক বাসিন্দা মো. মতিন বলেন, বাসে ঢাকায় যেতে অনেক বেশি অর্থ ব্যয় হয় এবং সড়কপথে নানা ধরনের ঝুঁকিও রয়েছে। ট্রেন চালু হওয়ায় কম খরচে নিরাপদ ও স্বাচ্ছন্দ্যে রাজধানীতে যাতায়াত করা যাবে।
গোপালগঞ্জ রেলস্টেশনের স্টেশন মাস্টার রত্না বৈদ্য জানান, গোপালগঞ্জ থেকে রাজশাহী রুটে ট্রেন চলাচল করলেও ঢাকার সঙ্গে সরাসরি রেলসেবা ছিল না। নতুন ট্রেন চালুর ফলে স্থানীয় মানুষের দীর্ঘদিনের যাতায়াত সমস্যা অনেকটাই কমবে। একই সঙ্গে যাত্রী সংখ্যা বাড়লে সরকারের রাজস্ব আয়ও বাড়ার সম্ভাবনা রয়েছে।
তবে নির্ধারিত সময়সূচি নিয়ে কিছুটা ভিন্নমতও রয়েছে। স্টেশনে আসা যাত্রী মো. মাসুদ রানা বলেন, ট্রেন চালু হওয়া নিঃসন্দেহে আনন্দের খবর। তবে সকালে ট্রেন ঢাকার উদ্দেশে ছাড়লে যেসব মানুষ অফিস বা ব্যবসার কাজে রাজধানীতে যান, তারা একই দিনে কাজ শেষ করে আবার গোপালগঞ্জে ফিরতে পারতেন। তাই ভবিষ্যতে সময়সূচি পুনর্বিবেচনার বিষয়টি কর্তৃপক্ষ বিবেচনা করতে পারে।
স্থানীয়দের প্রত্যাশা, ঢাকা-গোপালগঞ্জ সরাসরি রেল যোগাযোগ শুধু যাতায়াতের খরচ ও সময় কমাবে না, বরং শিক্ষা, চিকিৎসা, চাকরি, ব্যবসা ও কৃষিপণ্য পরিবহনের ক্ষেত্রেও নতুন সুযোগ সৃষ্টি করবে। গোপালগঞ্জের পাশাপাশি আশপাশের বাগেরহাট ও পিরোজপুর জেলার মানুষও এই রেলসেবার সুফল পাবেন বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
দীর্ঘদিনের অপেক্ষার পর চালু হতে যাওয়া ‘অভিযাত্রী কমিউটার’ তাই শুধু একটি নতুন ট্রেন নয়—গোপালগঞ্জের সঙ্গে রাজধানীর যোগাযোগ ও আঞ্চলিক অর্থনীতিতে নতুন সম্ভাবনার দুয়ার খুলবে, এমনটাই প্রত্যাশা স্থানীয় মানুষের।