খসে পড়েছে দেয়ালের পলেস্তারা, ধসে গেছে ছাদ আর প্রাচীন প্রাচীর। তবুও বুক চিতিয়ে দাঁড়িয়ে থেকে অতীতের সোনালী ইতিহাসের জানান দিচ্ছে নওগাঁর আত্রাই উপজেলার ‘ভবানীপুর জমিদার বাড়ি’। রোমান স্থাপত্য শৈলীতে নির্মিত এই ঐতিহাসিক নিদর্শনটি আজ চরম অবহেলা আর অযত্নে বিলীন হওয়ার পথে। অথচ ভাঙা দেয়ালে কান পাতলে যেন আজও শোনা যায় প্রাচীন রাজপ্রাসাদের কোলাহল, দাস-দাসীদের ব্যস্ত পায়ের শব্দ আর আনন্দ-বেদনার কাব্য।
নওগাঁর আত্রাই উপজেলা সদর থেকে মাত্র ৮ কিলোমিটার দূরে, আত্রাই ও ছোট যমুনা নদীর তীর ঘেঁষে ভবানীপুর বাজারের পাশেই এই রাজবাড়ির অবস্থান। স্থানীয়দের কাছে এটি ‘ভবানীপুর রাজবাড়ি’ নামেই সমধিক পরিচিত। পারিবারিক ইতিহাস ও স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, এই জমিদার পরিবারের আদি পুরুষ ছিলেন রঘুরামশংকর চৌধুরী। তাঁর স্ত্রী দুর্গাময়ী ছিলেন নাটোরের শূর বংশের সন্তান। মূলত রাজত্বের কাজে ভবানীপুরে এসে এলাকাটি পছন্দ হওয়ায় তিনি এখানে স্থায়ীভাবে বাড়ি নির্মাণ করেন এবং নাটোর মহারাজার অনুমতি নিয়ে জমিদারি পত্তন করেন।
পরবর্তীতে রঘুরামশংকরের ছেলে গিরিশংকর চৌধুরী জমিদার হন এবং তাঁর আমলেই মূলত এর ব্যাপক বিস্তার ঘটে। গিরিশংকরের মৃত্যুর পর জমিদারি পরিচালনা করেন তাঁর একমাত্র পুত্র প্রিয়শংকর চৌধুরী। প্রিয়শংকরের শাসনামলে শুধু স্থাপত্যশৈলীরই বিকাশ ঘটেনি, প্রজাকল্যাণে শিক্ষা প্রতিষ্ঠান, রাস্তাঘাট নির্মাণ ও পুকুর খননসহ নানা উন্নয়নমূলক কাজ করা হয়। পিতার স্মৃতি রক্ষার্থে তিনি প্রতিষ্ঠা করেন ‘ভবানীপুর জিএস (গিরিশংকর) উচ্চ বিদ্যালয়’।
১৯৪৭ সালের দেশভাগের পর জমিদারি প্রথা বিলুপ্ত হলে জমিদার প্রিয়শংকর চৌধুরী কলকাতায় চলে যান। তবে তাঁর শিকড় ছেঁড়েননি চতুর্থ পুত্র প্রতাপশংকর চৌধুরী। তিনি ভবানীপুরেই থেকে যান এবং শিক্ষকতাকে পেশা হিসেবে বেছে নেন। ২০০৫ সালে কুমার প্রতাপশংকর চৌধুরীর মৃত্যুর পর তাঁর পরিবার এই প্রাসাদের একটি অংশে বসবাস শুরু করেন। বর্তমানে এই ভগ্নপ্রায় জমিদার বাড়ির পিছনের একটি অংশে চরম ঝুঁকি নিয়ে কোনোমতে দিন কাটাচ্ছেন প্রতাপশংকর চৌধুরীর স্ত্রী চিত্রা চৌধুরী, ছেলে অভিজিৎ চৌধুরী, মেয়ে স্নেহা চৌধুরীসহ পরবর্তী প্রজন্ম।
বেদনাভারাক্রান্ত কণ্ঠে জমিদার বংশের বর্তমান উত্তরসূরি অভিজিৎ চৌধুরী জানান, জমিদারির আমলে আমাদের প্রায় তিন হাজার বিঘা জমি ছিল। কিন্তু সময়ের পরিক্রমায় ও সঠিক তদারকির অভাবে তার প্রায় সবই এখন বেদখল হয়ে গেছে। এখন শুধু এই ভাঙা বাড়িটুকুই স্মৃতি হিসেবে অবশিষ্ট আছে।
প্রাসাদটি প্রায় ধ্বংসস্তূপে পরিণত হলেও এর নান্দনিক রোমান স্থাপত্যশৈলী দেখতে প্রতিদিন সকাল থেকে সন্ধ্যা পর্যন্ত দূর-দূরান্ত থেকে ছুটে আসেন ইতিহাসপ্রেমী ও পর্যটকরা।
সমাজসেবক খোরশেদ আলম বলেন, ভবানীপুর জমিদার বাড়ি শুধু একটি স্থাপনা নয়, এটি আমাদের ঐতিহ্য ও ইতিহাসের জীবন্ত সাক্ষী। অথচ যথাযথ সংরক্ষণের অভাবে প্রাসাদটি বিলীন হয়ে যাচ্ছে। এই ঐতিহাসিক স্থাপনাটি দ্রুত সংস্কার করা হলে একে ঘিরে চমৎকার একটি পর্যটন কেন্দ্র গড়ে ওঠা সম্ভব। ইতিহাসের পাতা থেকে চিরতরে হারিয়ে যাওয়ার আগেই এই প্রাচীন রোমান স্থাপত্যের রাজবাড়িটি প্রত্নতত্ত্ব অধিদপ্তরের আওতায় নিয়ে সংস্কারের জোর দাবি জানিয়েছেন আত্রাইয়ের সচেতন মহল।